প্রাপ্তবয়স্কদের হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি

আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

বাংলাদেশে শিশুদের পাশাপাশি এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করাও এবং এই রোগের বিস্তার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কিছু এলাকায় প্রাপ্তবয়স্কদের হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো এলাকার হাসপাতালে আক্রান্ত বড়দের চিকিৎসার জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডও চালু করা হয়েছে।

২০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রাপ্তবয়স্করা কেন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং তাদের নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ আছে কি-না। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শিশুদের জন্য যতটা উদ্বেগের কারণ, বড়দের জন্য পরিস্থিতি ঠিক ততটা উদ্বেগের নয় বলেই তারা মনে করেন। তবে বাংলাদেশে রোববার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ইতোমধ্যে ৪৫৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে শুরু করেছিল। বিশেষজ্ঞরা এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গত কয়েক বছরে শিশুদের ঠিকমতো হামের টিকা না দেওয়াকে। এর আগে গত মাসের শেষ দিকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশে হামের টিকার তীব্র ঘাটতি এবং একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

প্রায় নির্মূল হওয়া হাম আবার ফিরে আসার কারণ

ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বড়রাও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে দেশের সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এমনকি ঢাকার বাইরেও কয়েকটি জায়গায় কুড়ি বছরের বেশি বয়সীদের হামে আক্রান্ত হওয়া কিংবা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে হামের চিকিৎসার জন্য শিশুদের পৃথক ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারো বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ‘ইনফেকশাস ব্লক’ তৈরি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মদ শফি বলছেন, বড়দের সাধারণত শিশুদের তুলনায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে এবং সে কারণেই তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কম থাকে। তবে নানা কারণে কারও শরীরে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, তবে তিনিও শিশুদের মতোই একই ভাবে হামে আক্রান্ত হতে পারেন। যদিও সাধারণত বড়রা চিকিৎসায় সহজেই সেরে ওঠেন। তিনি আরও জানান, অন্য রোগের কারণে যারা ইতোমধ্যে দুর্বল, যারা ক্যান্সার বা এ ধরনের রোগে আক্রান্ত কিংবা কোনো রোগের চিকিৎসার কারণে যাদের স্টেরয়েড নিতে হচ্ছে, যারা টিবি বা যক্ষ্মায় আক্রান্ত এবং সর্বোপরি হার্ড ইমিউনিটি কমে গেলে যে কেউ হামে আক্রান্ত হতে পারে।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, যখন একটি এলাকার বেশিরভাগ মানুষকে কোনো একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক বা টিকা দেওয়া হয়, তখন ওই এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আর থাকে না। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে, একটি সম্প্রদায়ের কারও মধ্যে যদি হাম দেখা দেয় এবং সেখানকার বেশিরভাগ মানুষের যদি টিকা দেওয়া থাকে, তাহলে সেই রোগটি আর নতুন করে কারও মধ্যে ছড়াতে পারে না। একেই মূলত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা ‘কমিউনিটি ইমিউনিটি’ বলা হয়। এর সুফল হিসেবে নবজাতক শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষ যাদেরকে কোনো কারণে টিকা দেওয়া সম্ভব হয় না, তারাও রোগমুক্ত থাকেন।

কিন্তু বর্তমানে ব্যাপকভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই হার্ড ইমিউনিটি আর কার্যকর নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সে কারণেই শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও হামে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনেকে ধারণা করছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন করে হামের টিকা ব্যাপকভাবে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং আগামী মাসে ভিটামিন ‘এ’ টিকা খাওয়ানোর কর্মসূচিও রয়েছে। এর আগে সম্প্রসারিত টিকাদান বা ইপিআই কর্মসূচিতে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হতো ৯ মাস বয়সে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে এগিয়ে এনে ৬ মাস করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে ৮০ শতাংশের বেশি শিশু টিকার আওতায় চলে এলে আবারও হামের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যাবে।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে মোট প্রায় ৫৮ হাজার মানুষ সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে বড়দের বা প্রাপ্তবয়স্কদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কত—তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। জনস্বাস্থ্যexpert বা বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় যারা রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কিংবা যাদের কিডনির ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন, হামের ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যে মূলত তাদেরই ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া বড়রা আক্রান্ত হলেও তা সাধারণত সেরে ওঠে; হামের জন্য মূলত শিশুরাই ঝুঁকিপূর্ণ এবং সে কারণেই শিশুদের প্রধানত টিকা দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, হামের এই ফিরে আসা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নত দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আবার দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছে যে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ার কারণেই বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান বা নতুন করে বিস্তার দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা বিষয়ক বিখ্যাত জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ে সারাবিশ্বেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছিল। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে টিকা-বিরোধী প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মূলত হামের সংক্রমণ ফিরে আসার পথ তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও হাম ফিরে আসার পেছনে গত কয়েক বছরে ঠিকমতো টিকা দিতে না পারার ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে সরকার। সূত্র: বিবিসি বাংলা

SN
আরও পড়ুন