পুরুষাঙ্গের আকার বাড়াতে ফিলার, চিকিৎসকদের সতর্কতা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

পুরুষদের মধ্যে যৌনাঙ্গের পুরুত্ব বাড়াতে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং শরীর নিয়ে বদলে যাওয়া সামাজিক প্রত্যাশার কারণে কিছু ক্লিনিকে এ ধরনের চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, ভুলভাবে প্রয়োগ করা হলে সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধনের এই পদ্ধতি গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের জেসন নামের এক ব্যক্তি এমন চিকিৎসা নিয়ে দাবি করেছেন, তার যৌনাঙ্গের পুরুত্ব প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি জানান, পরিবর্তনটি তার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে। তবে অতিরিক্ত ফিলার দিয়ে অস্বাভাবিকভাবে মোটা করার পদ্ধতি তিনি বেছে নেননি।

জেসনের লক্ষ্য ছিল দৈর্ঘ্য বাড়ানো নয়, বরং পুরুত্বে কিছুটা পরিবর্তন আনা এবং আকৃতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা। প্রায় এক বছর বিভিন্ন পদ্ধতি বিবেচনার পর তিনি অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার বেছে নেন।

এই ফিলার স্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে এটি শরীরে শোষিত হয়ে যায় এবং সাধারণত ছয় থেকে নয় মাস পর এর প্রভাব কমতে শুরু করে। ফলে ফলাফল পছন্দ না হলে পরিবর্তনটি স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম, এই বিষয়টিও জেসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

কেন বাড়ছে আগ্রহ

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের শরীর ও যৌন সক্ষমতা নিয়ে সামাজিক ধারণার পরিবর্তন এই প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং পর্নোগ্রাফিতে প্রদর্শিত শরীরের ধারণা অনেক পুরুষের নিজের শরীর সম্পর্কে প্রত্যাশা বদলে দিচ্ছে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের একটি ক্লিনিকে এ ধরনের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক জাভেদ হুসেইনের কাছে বিভিন্ন বয়সের পুরুষ আসছেন। তাঁদের মধ্যে ২০-এর কোঠার তরুণ থেকে ৭২ বছর বয়সী পুরুষও রয়েছেন।

চিকিৎসার আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা, কেন তিনি পদ্ধতিটি নিতে চাইছেন এবং তাঁর প্রত্যাশা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এরপর যৌনাঙ্গের নির্দিষ্ট অংশে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড প্রয়োগ করে তা সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে ম্যাসাজ করা হয়। চিকিৎসার পরও রোগীকে নির্দিষ্ট নিয়মে ম্যাসাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ধরনের চিকিৎসায় খরচ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে এবং সাধারণত পুরুত্ব ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি করা হয়। তবে এর প্রভাব সাময়িক।

ঝুঁকি কোথায়

চিকিৎসকদের প্রধান উদ্বেগ হলো সম্ভাব্য জটিলতা। ফিলার দেওয়ার পর ব্যথা, ফোলা, কালশিটে দাগ এবং ফিলার অসমভাবে ছড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে সংক্রমণও হতে পারে।

আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হয় ভুল জায়গায় বা ভুল পদ্ধতিতে ফিলার প্রয়োগ করা হলে। যৌনাঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।

হুসেইন এমন একজন রোগীর চিকিৎসার কথা জানিয়েছেন, যিনি অন্য জায়গা থেকে ফিলার নেওয়ার পর যৌনাঙ্গের ত্বক কালো হয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। ভুল ধরনের ফিলার ব্যবহারের পাশাপাশি রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই ব্যক্তির ত্বকে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে টিস্যু মারা যেতে শুরু করে। পরে তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়।

ম্যানচেস্টারের এনএইচএসের ইউরোলজিক্যাল সার্জন অধ্যাপক বৈভব মোদগিলও এ ধরনের জটিলতার রোগী দেখেছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি গুরুতর হলে যৌনাঙ্গের ত্বকের একটি অংশ মারা যেতে পারে এবং পরে তা খসে পড়তে পারে।

অস্ত্রোপচারেও ঝুঁকি

শুধু ফিলার নয়, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যৌনাঙ্গের আকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে।

জার্মানিতে অস্ত্রোপচার করানো অ্যালেক্স নামের এক ব্যক্তি যৌনাঙ্গকে তুলনামূলক লম্বা দেখানোর জন্য একটি লিগামেন্ট কাটিয়েছিলেন। একই সঙ্গে শরীরের অন্য অংশ থেকে চর্বি নিয়ে যৌনাঙ্গে প্রয়োগ করা হয়।

অস্ত্রোপচারের পর তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগেছেন, পায়ে ব্যাপক কালশিটে পড়েছিল এবং কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারেননি। পরে চিকিৎসায় সুস্থ হন তিনি।

অ্যালেক্স বলেন, সামাজিক ধারণা ও পর্নোগ্রাফির প্রভাবেই একসময় তিনি মনে করেছিলেন বড় যৌনাঙ্গ পুরুষত্বের প্রতীক। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এই ধারণাই নিজের শরীর নিয়ে তাঁর অসন্তুষ্টিকে প্রভাবিত করেছিল।

দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা

এ ধরনের চিকিৎসা কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে অনলাইন সার্চ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিজ্ঞাপনের প্রবণতা দেখে চিকিৎসকদের ধারণা, এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস ৩৬টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছে, যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ পুরুষের তথ্য ছিল। তারপরও দীর্ঘমেয়াদে এসব চিকিৎসা কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ঘাটতি। যৌনাঙ্গে ফিলার বছরের পর বছর ব্যবহারের পর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।

এ ছাড়া সব জায়গায় এ ধরনের ফিলার প্রয়োগের জন্য সমান মাত্রার চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে চিকিৎসা নেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

অধ্যাপক মোদগিল সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে এই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। কতজন পুরুষ এ ধরনের চিকিৎসা নিচ্ছেন, কী ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল কী, এসব তথ্য সংরক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে একটি রেজিস্ট্রি চালুরও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

তবু জেসনের মতো কিছু রোগী ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট। বর্তমান ফিলারের প্রভাব শেষ হয়ে গেলে আবারও চিকিৎসাটি নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনিও। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুধু আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আশায় এমন চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের যোগ্যতা, ব্যবহৃত উপাদান, সম্ভাব্য জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি।

AS
আরও পড়ুন