প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: নাম বাদ পড়ার অভিযোগে ফেসবুকে সমালোচনার ঝড়

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ এএম

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীর নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন অনেক প্রার্থী। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ তুলে অনেকে ফেসবুকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়োগের আদেশ জারি শুরু হয়। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও অনেক প্রার্থী নিয়োগের তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজে পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। ১৫ জেলার অন্তত ৩৫১ জনের নিয়োগপত্র না পাওয়ার তথ্য বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের খোঁজে পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি জেলা থেকেও একই ধরনের অভিযোগ এসেছে।

এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার ‘নেগেটিভ’ প্রতিবেদনের কারণে তাদের নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে। আবার কারও দাবি, নিজের বা পরিবারের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন তারা।

এক গণমাধ্যমকর্মী নূর হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রাইমারির ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া ভাই-বন্ধুদের পোস্ট দেখে চোখের পানি আটকাতে পারতেছি না। খোদার কসম, এসব দেখার জন্য জুলাই হয়নি।’

বৃহস্পতিবার রাতে আইনুল হক নামের এক প্রার্থীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হতাশার কথা জানান। তিনি লেখেন, ছোটবেলা থেকে ‘ক্লিন ইমেজ’ বজায় রেখে চলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিরপেক্ষ থাকার পরও অজানা কারণে ভেরিফিকেশনে তার নাম বাদ পড়েছে।

ঘটনাটিকে ‘ভাগ্যের নির্মম পরিহাস’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলা-মোকদ্দমা থেকে দূরে থেকেও শেষ পর্যন্ত ভেরিফিকেশনের কারণেই চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বিকাশ দাশ নামের আরেক প্রার্থীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, তার নিজের বা পরিবারের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। কিন্তু তার গ্রামের সঙ্গে একজন সাবেক সংসদ সদস্যের এলাকার সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি বাদ পড়ে থাকলে সেটি অন্যায় হবে—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

জেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৫ জেলায় অন্তত ৩৫১ জন চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১২০, বগুড়ায় ৪৮ এবং পাবনায় ৩৫ জনের নাম নিয়োগের আদেশে না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও ঝালকাঠিসহ আরও কয়েকটি জেলায়ও এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। আরও কয়েকটি জেলা থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলেও কতজন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগপত্র আটকে থাকার সম্ভাব্য কারণ একাধিক। এর মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন, জমা দেওয়া কাগজপত্রে অসংগতি এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলায় শূন্যপদের পরিস্থিতি রয়েছে।

তবে ৩৫১ জনের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, তা এখনো কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। কয়েকটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলে জানিয়েছেন।

নিয়োগপত্র দেওয়ার আগে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা, ডোপ টেস্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে নিয়োগপত্র স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রার্থীদের একটি অংশ দাবি করছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন কিংবা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘নেগেটিভ’ তথ্য আসার কারণে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।

বৃহস্পতিবার তিনি জানান, নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে এবং অনেক এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এ কারণে ১ অক্টোবর পর্যন্ত যোগদানের সময় রাখা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন—এমন নির্দিষ্ট তথ্য তখনো তার কাছে আসেনি।

নতুন করে এনএসআই ভেরিফিকেশনের কারণে কেউ বাদ পড়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবেও তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে কোনো প্রার্থীর বাদ পড়ার তথ্য তার কাছে নেই।

অন্যদিকে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিরূপ তথ্য, কাগজপত্রে অসংগতি কিংবা শূন্যপদের বিষয়সহ বিভিন্ন কারণে নিয়োগ আটকে থাকতে পারে। তবে ৩৫১ জনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণ কার্যকর হয়েছে, তা তিনি জানাননি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। মৌখিক পরীক্ষা শেষে ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।

এরপর দীর্ঘ সময় নিয়োগ ও পদায়ন না হওয়ায় সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। নিয়োগ ও পদায়নের দাবিতে তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, অবস্থান ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালন করেন। পরে ১ অক্টোবর যোগদানের সময় নির্ধারণ করা হয় এবং ৪ অক্টোবর থেকে পদায়ন শুরুর কথা জানানো হয়।

২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হওয়ায় দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হওয়ার কথা থাকলেও নতুন করে নাম না থাকার অভিযোগে অনেক প্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রার্থীদের মূল দাবি—কেন তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। যদি ভেরিফিকেশনে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সেটি কী এবং তার ভিত্তি কী—তা জানানো উচিত বলেও অনেকে দাবি করছেন।

তাদের মতে, চূড়ান্ত ফলাফলে সুপারিশ পাওয়ার পর দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তাদের সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সম্পর্কের অভিযোগের ভিত্তিতে কেউ বাদ পড়েছেন কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান তারা।

অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সব প্রার্থীকে একইভাবে বাদ দেওয়া হয়নি এবং নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানোর কারণে কোথাও কোথাও বিলম্বও হতে পারে। পাশাপাশি যেসব প্রার্থীর তথ্য বা যাচাইয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে, তাদের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র স্থগিত রেখে কারণসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ভেরিফিকেশনে বাদ’–এর অভিযোগের পাশাপাশি ডাকযোগে নিয়োগপত্র পৌঁছাতে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক যাচাই—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে কতজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছেন এবং প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কী কারণ ছিল, তা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা ব্যাখ্যা প্রকাশের পরই পরিষ্কার হবে।

এমএজেড
আরও পড়ুন