রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা নিউমার্কেটের কাছাকাছি একটি পুরোনো পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট। সকালবেলা রান্নাঘর থেকে নীলার মেহেদি রাঙা হাতের চুড়ির আওয়াজ ভেসে আসছে। এক বছরের ছেলে শাহেদ খাটের উপর হামাগুড়ি দিয়ে বাবার ছবির ফ্রেমটা তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
শফিক তখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। রাত বারোটায় অফিসের ফাইল নিয়ে বসেছিলেন, কবে যে ঘুমিয়ে পড়েছেন নিজেও জানেন না। নীলা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বেডরুমে এলো। স্বামীর ক্লান্ত মুখখানি দেখে তার খুব মায়া হলো। চুপিসারে চায়ের কাপ রেখে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো।
‘ওঠো শফিক, সকাল সাড়ে ৭টা। অফিসের সময় হয়ে আসছে।’
শফিক চোখ মলে উঠে বসলো। ঘড়িতে তাকিয়ে চমকে গেল। তাড়াতাড়ি গোসল করে তৈরি হতে লাগল। নীলা তার ব্যাগে টিফিন আর চায়ের কাপ গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, ‘আজকে মাসের প্রথম দিন, বেতন পেলে শাহেদের জন্য একটা দামি জামা কিনে দিও।’

শফিক হাসলো। ‘আজকে বোনাসও পাব। সেটা দিয়ে তোমার জন্য একটা চুড়ি কিনে দেবো।’
নীলার মুখে লালিত্য ফুটে উঠলো। সে স্বপ্ন দেখে—স্বামীর চাকরি ভালো যাচ্ছে, একদিন হয়তো নিজের একটা বাড়ি হবে, শাহেদকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারবে। সংসারের চাকা সচল, খুব বেশি না, তবু স্বপ্নের ভোরটা খুব সুন্দর।
শফিক যখন বেরিয়ে গেলো, নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালো। স্বামী রিকশায় উঠে অফিসের দিকে রওনা হলো। নীলা কল্পনা করলো, পনেরো বছর পর শাহেদ হয়তো বড় হয়ে কোনো ভালো চাকরি করবে, তখন তাদের সংসার কেমন হবে।
২.
করোনা মহামারি। ঘরে বন্দি জীবন। অফিসে যাওয়া যায় না, সব কাজ অনলাইনে। শফিক দিনের পর দিন ল্যাপটপের সামনে বসে থাকেন। অফিসের কাজ শেষ হলে ফেসবুক ব্রাউজ করেন। একদিন স্ক্রলে স্ক্রলে তার চোখ আটকে যায় একটি বিজ্ঞাপনে—
‘অনলাইনে খেলুন, জিতুন লাখ টাকা। ফ্রি বোনাস ২০০ টাকা।’
শফিক প্রথমে পাত্তা দেননি। ‘এগুলো সব প্রতারণা,’ তিনি মনে মনে বলেন। কিন্তু দিন দিন তার ফিডে বারবার ওই বিজ্ঞাপন আসতে থাকে। কৌতূহল হলো। একদিন রাতে ভাবলেন, কী আছে দেখি। লিংকে ক্লিক করতেই একটি অ্যাপ ডাউনলোড হলো—‘লাকি গেম’।
নিবন্ধন করতে বিনামূল্যে ২০০ টাকা বোনাস দিলো। কোনো টাকা লাগছে না। শফিক ভাবলেন, মজা করেই খেলা যাক।
প্রথম খেলায় তিনি ২০০ টাকা বোনাস দিয়ে খেললেন। অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ কাজ করল তার মনে। কিছুক্ষণের মধ্যে স্ক্রিনে দেখালো—জিতেছেন ১ হাজার টাকা। টাকা তুলতে পারবেন বিকাশে।
শফিক হাত কাঁপা অবস্থায় টাকা তুললেন। বিকাশে ১ হাজার টাকা এলো। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। এত সহজ টাকা! কী মজা!
পরের দিন তিনি নিজের ৫০০ টাকা জমা দিয়ে খেললেন। আবারও জিতলেন—এইবার ৩ হাজার টাকা। তিন দিনে তিনি জিতে ফেললেন মোট ৫ হাজার টাকা।
রাতে শফিক নীলাকে খুশি খুশি গলায় বললো, ‘দেখো, কিছু বিনিয়োগ করেছি, ভালো লাভ হচ্ছে।’
নীলা তার বিশ্বাসী স্বামীকে দেখে হাসলো। ‘আচ্ছা, বিনিয়োগ তো অনেক আগে থেকেই করতে পারতে।’
শফিকের মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি। তিনি জানেন না, এই ৫ হাজার টাকাই আসলে জুয়ার জগতে জেলের টোপ। মাছ যখন টোপ গিলে ফেলে, তখনই আসল ব্যাপার শুরু হয়।
৩.
চতুর্থ দিন। শফিক খেলতে বসেছে ২ হাজার টাকা জমা দিয়ে। কিন্তু এবার টাকাগুলো একের পর এক হারিয়ে যেতে লাগলো। ‘আরে! কী হলো?’ তিনি আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। এক মুহূর্তেই ২ হাজার টাকা শূন্য।
তার মাথা ঘুরপাক খেতে লাগলো। টাকা তোলার জন্য আরও ৩ হাজার জমা দিলেন। সেটাও হারিয়ে গেলো। আরও ৫ হাজার—সেটাও।
শফিকের মাথা গরম হয়ে গেলো। তিনি বুঝতে পারছেন না, প্রতিটি খেলায় তার টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে কেন। আসলে অ্যাপটি এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, যাতে খেলোয়াড় কিছুক্ষণ জিতলেও শেষমেশ সব হারায়। শফিক সেটা বুঝতে চান না। তার মস্তিষ্কে শুধু একটা চিন্তা: ‘আর একবার জিতলেই সব ফিরে পাব।’
মাস শেষে তিনি দেখলেন, ৫ লাখ টাকা হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শূন্য। কিছু বন্ধুর কাছে ধার করেছেন। কয়েকজন আত্মীয়কেও ফোন করে টাকা নিয়েছেন।
নীলা লক্ষ্য করলো, স্বামী দিনদিন অস্থির হয়ে যাচ্ছে। টাকা ফোনে লেনদেন করছে। জিজ্ঞেস করলে শফিক বলে, ‘বিনিয়োগ করছি এক ব্যবসায়, শিগগিরই লাভ আসবে।’
নীলারও একটু হাইস্ট্যাটাস পছন্দ। সে ভাবে, স্বামী হয়তো ভালো ব্যবসা করছে, তাই টাকা লাগছে। কিন্তু একদিন রাতে স্বামীর ফোনের নোটিফিকেশন দেখে সে চমকে যায়—‘লাকি গেম থেকে ৫০০০ টাকা জমা হয়েছে।’ নীলার বুক কেঁপে ওঠে।
সে স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কী?’
শফিক প্রথমে এড়িয়ে যায়, পরে রেগে যায়। ‘আমার কাজে তুমি হস্তক্ষেপ করো না।’
নীলা চুপ করে যায়, কিন্তু তার ভেতরে সংশয় ঘনীভূত হতে থাকে।
৪.
শফিকের জুয়ার নেশা ক্রমশ মারাত্মক আকার ধারণ করে। অফিসের সময়ও তিনি খেলতে শুরু করেন। ডেস্কে বসে ল্যাপটপের এক কোণে ‘লাকি গেম’ খোলা থাকে। ফাইল দেখার ভান করে আসলে খেলা চলে। কাজের ঘাটতি ধরা পড়লো।
তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাসান সাহেব তাকে ডেকে পাঠালেন। ‘শফিক সাহেব, আপনার কাজের মান খুব খারাপ হচ্ছে। কী হয়েছে?’
শফিক একগাদা অজুহাত দিলো। ‘স্যার, করোনার পর সবাই বাড়ি থেকে কাজ করছে, আমি একটু সমস্যায় আছি।’
হাসান সাহেব সতর্ক করে দিলেন, ‘আমি কিছু বোঝার আগেই আপনি নিজেকে সামলান।’
কিন্তু শফিকের থামার উপায় নেই। তিনি অফিসের কাছের এক সুদ ব্যবসায়ী জামালের কাছে গেলেন। জামাল একজন ভদ্র চেহারার মানুষ, কিন্তু তার সুদের হার ২০ শতাংশ মাসে।
‘দুই লাখ টাকা লাগবে’, শফিক বললো।
জামাল হাসলো। ‘সব ঠিক আছে, কিন্তু সময়মতো দিতে হবে।’
শফিক সেই টাকা নিয়েই তিন দিনে খেলায় উড়িয়ে দিলো। এরপর আরও টাকা লাগে। তিনি কাস্টমারের কাছ থেকে পাওয়া টাকা অফিসে জমা না দিয়ে খেলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই টাকার পরিমাণ দাঁড়ালো ৫০ লাখ টাকা।
এদিকে, মেজো ভাই শহিদের কাছে সে টাকা চাইতে যায়। শহিদ একটি ফার্নিচার কোম্পানিতে চাকরি করেন, ব্যবসাও করেন। বেশ বিত্তশালী। শহিদ ছোটভাইকে খুব স্নেহ করেন। টাকা দিতে তিনি কখনো দ্বিধা করেন না।
‘কী হয়েছে শফিক? এত টাকার কী দরকার?’ শহিদ জিজ্ঞেস করলো।
‘একটা ব্যবসা করছি, বন্ধুরা সহযোগিতা করছে।’
শহিদ বিশ্বাস করলো। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দিলো। এরপর সেজো ভাই শাওনের কাছ থেকেও টাকা নিলো শফিক। শাওন দুই মেয়ে নিয়ে সংসার, তবুও তিনি ভাইকে সাহায্য করেন।
শফিক এই টাকাগুলো দিয়ে সুদ শোধ করলো। বাকি টাকা আবার খেলায় উড়িয়ে দিলো।
৫.
একদিন অফিসে ধরা পড়ে গেলো শফিকের আসল রহস্য। এক কর্মচারী তার ডেস্কে ‘লাকি গেম’ খোলা দেখে ম্যানেজারকে জানায়। ম্যানেজার হঠাৎ পরিদর্শনে এসে শফিকের ল্যাপটপের স্ক্রিন দেখে চমকে যান। শফিক তখন খেলায় মগ্ন।
‘শফিক সাহেব! এটা কী?’
শফিক ঘাবড়ে গিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ম্যানেজার থামিয়ে দেন। ‘আপনি কাজের সময় জুয়া খেলছেন? কোম্পানির মোবাইলে অ্যাপ ডাউনলোড করে টাকা লেনদেন করছেন?’
পরদিন শফিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। কারণ দর্শিয়ে তার চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। অফিসের ৫০ লাখ টাকার হিসাবও ফাঁস হয়ে গেলো। অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে বলে, ‘এ টাকা না দিলে মামলা হবে, আপনি কারাগারে যাবেন।’
শফিক স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মাসিক আয় নেই, অথচ ঋণের কিস্তি চলছে, সংসার চলবে কীভাবে? স্ত্রী নীলা এ খবর জানতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। ছেলে শাহেদ কিছু বুঝতে না পেরে কোলের কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো।
নীলা চিৎকার করে উঠলো, ‘তুমি আমাদের কী করলে? কী করলে বলো?’
শফিক চুপ করে থাকে। লজ্জায় মানুষের মুখ দেখতে পারে না। তিনি নিজের ঘরে বন্দি হয়ে যান। বাইরে বেরোতে পারেন না। প্রতিবেশীরা ফিসফাস করে কথা বলে। আত্মীয়দের ফোন আসে, ‘শুনলাম শফিক চাকরি হারিয়েছে?’
৬.
শফিকের অবস্থা দেখে শহিদ ও শাওন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা ঠিক করে, মায়ের শেষ সম্বল গহনা ও ৪ শতাংশ জমি বিক্রি করে শফিকের অফিসের ঋণ শোধ করা হবে। কিন্তু বড় ভাই শুভ এতে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি ফেনীতে থাকেন, তিন সন্তান নিয়ে টানাটানি সংসার।
শুভ বলেন, ‘মা নিঃস্ব হয়ে যাবে। জমি ও গহনা ছাড়া তার আর কিছুই নেই। আমরা ভাই মিলে অন্য উপায় বের করি।’
শহিদ ও শাওন রাজি হন না। তারা গোপনে মায়ের কাছে যায়।
মা—বয়স ৭২। অসুস্থ, দুর্বল। স্বামী মারা গেছেন ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর। সেই থেকে একা। তার কিছু গহনা ও ৪ শতাংশ জমি—এটাই তার শেষ ভরসা।
শহিদ মাকে বলে, ‘মা, শফিকের বড় সমস্যা। তাকে বাঁচাতে হবে। তোমার জমি ও গহনা বিক্রি করি।’
মা অসম্মতি জানান। ‘না বাবা, এটা আমার শেষ সম্পদ। আমি অসুস্থ, ওষুধের টাকা লাগবে।’
শহিদ ও শাওন রেগে যান। তারা মাকে ভয় দেখাতে শুরু করেন। ‘মা, তুমি যদি জমি না দাও, তাহলে শফিক কারাগারে যাবে। তুমি কি তোমার ছেলেকে জেলে যেতে দেবে?’
মা কাঁদতে থাকে। শহিদ আরও কঠোর হয়। ‘মা, তুমি কি চাও আমরা তোমাকে আর দেখাশোনা করবো না? তোমার থাকার জায়গাও আমরা দেবো না?"
মা আরো ভয় পান। শেষে তিন ভাই মিলে মাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল, হুমকি ও নানা অত্যাচার করে জমি ও গহনা দিতে বাধ্য করে।
শহিদ চার শতাংশ জমি কিনে নেয় ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকায়—যদিও বাজারদর ৪০ লাখ টাকা। নগদ দেয় ১৫ লাখ টাকা। বাকি টাকা শফিকের আগের ধার হিসেবে কেটে নেন।
মা যখন জমির কাগজে সই করছে, তার হাত কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। নিজের শেষ সম্পদ নিজের ছেলের কাছে হাতছাড়া হচ্ছে। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে বলেন—‘আমার সন্তান বাঁচুক। আমি কিছু না থাকলেও ক্ষতি নেই।’
৭.
জমি ও গহনা বিক্রির পরও শফিকের অফিসের ৫০ লাখ টাকার ঋণ পুরোপুরি শোধ হয়নি। শহিদ ১৫ লাখ টাকা দিলেও বাকি ৩৫ লাখ টাকা রয়ে গেলো। শফিক এখন ঋণের জন্য আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, এমনকি অপরিচিতদের কাছেও হাত পাতছে। কোথাও পাচ্ছে না।
মা এখন দিশেহারা। তার কাছে কিছুই নেই। তাকে আশ্রয় দিতে কেউ রাজি নয়। শফিকের বউ নীলা বলে, ‘আমার ছোট ফ্ল্যাটে মাকে রাখা সম্ভব নয়।’
শহিদের বউ রুমা বলে, ‘মাকে রাখা যাবে না।’
শাওনের বউ জেসমিন বলে, ‘আমার দুই মেয়ে, তারা পড়াশোনা করে। মায়ের জন্য আলাদা ঘর নেই।’
বড় ভাই শুভ চায় মাকে রাখতে, কিন্তু তার বউ সেলিনা স্পষ্ট জানায়, ‘আমাদের সংসার তো টানাটানি, তিন সন্তান। মাকে রাখলে আমাদের খরচ বাড়বে। এছাড়া মা তো অসুস্থ, চিকিৎসার ব্যাপার।’
মা নিজেই সব শুনে নির্বাক। তিনি বুঝতে পারেন, ছেলেদের সংসারে তার কোনো জায়গা নেই। বউদের অত্যাচার, অবহেলা, মানসিক নির্যাতন—সব কিছু সামলাতে না পেরে একদিন মা নিজেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।
বাইরে অন্ধকার রাত। রাস্তায় নেমে মা দেখেন, তার পায়ে কোনো জুতা নেই। শীতের হাওয়া বইছে। তিনি কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন?
মসজিদের বারান্দায় বসে পড়েন। সেখানে একজন মুসল্লি এসে বলেন, ‘আপা, এখানে বসবেন না। ঠান্ডা লাগবে।’
মা কোনো কথা বলেন না। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
৮.
দিন যায়। মাস যায়। মা এখন দোকানে দোকানে, মসজিদের গেটে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নামাজিদের কাছ থেকে ভিক্ষা করে। কেউ কেউ চিনতে পারে—ইনি তো অমুকের মা! কিন্তু কেউ সাহায্য করতে আসে না।
মায়ের শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার, হাঁটুর ব্যথা, চোখের সমস্যা। ওষুধের টাকা নেই। তিনি ভিক্ষার কিছু পয়সা জোগাড় করে ওষুধ কেনেন।
একদিন মা একটি দোকানের সামনে ভিক্ষা করতে দাঁড়িয়েছিলেন। দোকানদার চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, ‘আপা, আপনার ছেলে তো শহিদ সাহেব বড় ব্যবসায়ী, তার একাধিক বাড়ি। আপনি এখানে কেন?’
মা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলেন, ‘আমার ছেলে নেই, আমি একা।’
দোকানদার হাসে, ‘আমি তো তাদের চিনি। আপনার ছেলেরা আপনার কী করছে?’
মা কোনো কথা না বলে চলে যান। পথে পথে ঘুরে বেড়ান। কখনো মসজিদের ইমাম সাহেব তাকে এক মুঠো ভাত দেন, কখনো একজন নারী তাকে এক কাপ চা দিয়ে পাঠান।
একদিন মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। জ্বরে কাঁপছে। পাশের একটি ফুটপাথে শুয়ে থাকেন। কেউ কাছে যায় না। একজন রিকশাওয়ালা কাছে এসে জলের বোতল দিয়ে যান। মা জল ঢকঢক করে পান করেন। ততক্ষণে রাত নেমে এসেছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে মা কাঁদেন। তার মনে পড়ে ছেলেদের ছোটবেলার কথা—শফিক যখন প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, শহিদ যখন স্কুলে প্রথম নামতা পার করেছিল, শাওন যখন তাকে ফুল এনে দিয়েছিল। সে সব দিন কোথায় গেলো?
৯.
আজ প্রায় এক বছর হয়ে গেছে মা পথে পথে ঘুরছেন। তার চোখে প্রায় আলো নেই। ডাক্তার বলেছেন, চিকিৎসা না করলে অন্ধ হয়ে যাবেন। কিন্তু চিকিৎসার টাকা নেই।
শফিক এখনো বেকার। নীলা একটি পার্টটাইম চাকরি পেয়েছে, কিন্তু সে স্বামীর ঋণের বোঝায় কাতর। শহিদ ও শাওন এখন মায়ের খোঁজও নেন না। তারা মনে করেন, মা হয়তো কোথাও চলে গেছেন।
শুভ কিছুদিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি শহিদের কাছে জিজ্ঞেস করে, ‘মা কোথায়?’
শহিদ বলে, ‘জানি না। তিনি নিজেই চলে গেছেন।’
শুভ চিৎকার করে, ‘তোমরা মাকে বের করে দিয়েছো, এখন বলো জানি না!’
শহিদ চুপ করে থাকেন। শুভ মায়ের খোঁজে বের হন। তিনি অনেক জায়গায় খোঁজে, কিন্তু পান না।
একদিন শুভ রাতে মসজিদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখে একজন বৃদ্ধা নারী মসজিদের পাশে বসে আছেন। কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা। শুভ কাছে গিয়ে তাকান—এ তো তার মা!
শুভ কেঁদে ফেলেন। ‘মা! তুমি এখানে?’
মা চিনতে পারেন ছেলেকে। কিন্তু তার মুখে কোনো আবেগ নেই। শুধু বলে, ‘আমার কোনো ছেলে নেই।’
শুভ মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। কিন্তু মা তখন এতটুকুই বললেন—‘আমার শেষ ইচ্ছা, আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, যেন আমার পরকাল ভালো হয়।’
শুভ মাকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু মা রাজি হন না। বলেন, ‘তোমার সংসারে গেলে তোমার বউ আমায় অত্যাচার করবে। আমি এখানেই ভালো আছি।’
শুভ কিছু বলতে পারেন না। তিনি মাকে কিছু টাকা দিয়ে যান। কিন্তু মা সেটা নেন না। বলেন, ‘তোমার সন্তানদের জন্য রেখো।’
১০.
ছয় মাস পর…
এক শীতের রাতে তিনি মসজিদের পাশের বারান্দায় ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে নামাজিরা এসে দেখলেন—তিনি আর নড়ছেন না। কেউ বলল, তীব্র ঠান্ডায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কেউ বলল, হয়তো কোনো অসুস্থতায় নিভে গেছে তাঁর জীবনপ্রদীপ।
মসজিদের পাশে পড়ে আছে মায়ের নিথর দেহ। নামাজিরা জড়ো হলেন। ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‘ওনার তো ছেলেরা আছে। তাদের খবর দেওয়া হোক।’
শহিদের খবর দেওয়া হয়। শহিদ আসে, দেখে মায়ের লাশ। তার চোখ ফেটে পানি পড়ে। কিন্তু স্ত্রী রুমা এসে বলেন, ‘এখন তো মারা গেছেন, লাশটা কোথায় দাফন করবো? আমাদের বাড়ির পাশের কবরস্থানে তো জায়গা নেই।’
শহিদ কিছু বললেন না। শাওন আসেন। শুভ আসেন। শফিক আসে—সে তখনো বেকার, ছেঁড়া কাপড়ে।
চার ভাই মায়ের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শুধু শফিক থপথপ করে কাঁদছে।
শহিদ শেষমেশ একটি সাধারণ কবরস্থানে জায়গা কিনে মাকে দাফন করেন। দাফনের সময় ইমাম সাহেব বলেন, ‘ওনার জন্য দোয়া করবেন। মা তো বড় দয়ালু ছিলেন। কিন্তু ছেলেরা কী করলো?’
শফিক সেই রাতে মায়ের কবরের পাশে বসে থাকে। হঠাৎ তার চোখে কিছু একটা ভেসে ওঠে—ছোটবেলায় মা তাকে কেমন আদর করতেন। মা যখন তাকে স্কুলে পাঠাতেন, তখন কী বলতেন—‘বাবা, বড় হয়ে মানুষ হও। মায়ের মুখ উঁচু করো।’
শফিক আজ কি করেছে? মায়ের মুখ উঁচু করলেন না, বরং মাকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য করলেন। তার সব হাতছাড়া, ঘর ছাড়া, চাকরি ছাড়া—তবুও সবচেয়ে বড় ক্ষতি, তিনি মাকে হারিয়েছেন।
রাত গভীর হয়। শফিক মায়ের কবরের মাটি চেপে ধরে কাঁদে। কিন্তু মা আর ফিরে আসেন না। তার শেষ কথাগুলো শফিকের কানে বাজে—‘আমার কোনো ছেলে নেই।’
শফিক আঁধারে চিৎকার করে ওঠে—‘মা! আমি তোমার ছেলে! আমি তোমার ছেলে!’ কিন্তু মা শোনে না। কবরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না।
শফিক আজ ঘরে ফিরে নীলাকে বলে, ‘আমার মা চলে গেছেন। আমি কীভাবে বাঁচবো?’
নীলা তাকায় স্বামীর দিকে। তার কোনো উত্তর নেই। শাহেদ তখন ঘুমাচ্ছে। জানালা দিয়ে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। নতুন একদিন শুরু হচ্ছে।
কিন্তু শফিকের জীবনে আর কোনো ভোর নেই। আজ থেকে তিনি একজন নিঃস্ব—সম্পদহীন, চাকরিহীন, নিঃস্বতম—কারণ তিনি হারিয়েছেন তার মাকে, যে ছিল তার শেষ আশ্রয়।
আজ শফিক যে পথে হাঁটে, সেই পথে প্রতিদিন অনেক মা হেঁটে যায়—যাদের ছেলেরা বড় হয়েছে, কিন্তু মনটা ছোট হয়ে গেছে। যার শেষ সম্পদ ছেলেদের হাতে নিঃস্ব হয়ে গেছে।