নজরুল: দ্রোহ, সাম্য ও মানবমুক্তির অনির্বাণ শিখা

আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম। তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস এবং সাংবাদিকতার প্রতিটি শাখায় উচ্চারিত হয়েছে বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও মুক্তির বাণী। তিনি ছিলেন কেবল একজন কবি নন; ছিলেন শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক অগ্নিমানব, যিনি কলমকে রূপ দিয়েছিলেন সংগ্রামের অস্ত্রে।

নজরুল মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ মানতেন না। ধর্ম, বর্ণ, জাত কিংবা শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনের বিপরীতে তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন মানবতার দর্শন। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, শাসকের শোষণ, সাম্রাজ্যবাদের দম্ভ এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল আপসহীন। তাই তার সাহিত্যকর্মে যেমন প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলই প্রথম কবি, যিনি গণমানুষের পক্ষে এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেখার কারণে কারাবরণ করেন। তার গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও তিনি থেমে যাননি। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ে তার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষের সাহসের প্রতীক। এ কারণেই তিনি পরিচিত হন ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে।

তার বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ কেবল সাহিত্য নয়, ছিল এক যুগের আত্মপ্রকাশ। ‘অগ্নিবীণা’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়শিখা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’—প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে তিনি অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন বজ্রকণ্ঠের ভাষা। আবার ‘কুলি-মজুর’, ‘মানুষ’ কিংবা ‘নারী’ কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন শ্রমিক, নিপীড়িত ও নারীর অধিকারের প্রশ্ন।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন অনন্য। তার কাছে হিন্দু-মুসলমান বিভেদের প্রতীক নয়, বরং একই মানবসমাজের দুই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তিনি লিখেছিলেন—

“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।”

আবার ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন—

“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?
কাণ্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।”

এই মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী চেতনার কারণেই নজরুল হয়ে উঠেছিলেন জনমানুষের কবি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় এসে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন নজরুল। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও রাজনীতির সংস্পর্শে এসে তার মধ্যে বিকশিত হয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনা। মুজাফফর আহমেদ-এর সান্নিধ্যে তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। রুশ বিপ্লবও তার চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

১৯২২ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দিতে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করে এবং নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে বসেই তিনি লিখেছিলেন ঐতিহাসিক ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, যা বাংলা সাহিত্যে সাহসী রাজনৈতিক সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।

কারাবন্দি অবস্থায়ও তার মনোবল ভাঙেনি। অনশন করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, আবার সৃষ্টি করেছেন অমর সাহিত্য। কবিগুরু রবীন্দ্রণাথ ঠাকুর পর্যন্ত তার সংগ্রামী চেতনার প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজের ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন নজরুলকে।

নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতে একইসঙ্গে বিদ্রোহ ও প্রেম, সাম্য ও সৌন্দর্য, প্রতিবাদ ও মানবতার সুর ধ্বনিত হয়েছে। তিনি যেমন রণতূর্য হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন, তেমনি বাঁশির সুরে গেয়েছেন প্রেম, মানবতা ও মুক্তির গান।

আজও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম ও ন্যায়বিচারের দাবিতে নজরুলের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়। তার সাহিত্য কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও প্রেরণা। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন শোষণহীন, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের চিরন্তন প্রেরণার নাম।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা, পুস্তক প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে কবির জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রিশাল-এ। কবির স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নজরুলসংগীত পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে।

রাজধানীতে বাংলা একাডেমি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে “দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি” শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের সমাপনী দিন পালিত হচ্ছে। এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউট-এর উদ্যোগেও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

AS/FJ
আরও পড়ুন