শব্দে গাঁথা জীবনের গল্পে সরকার আবদুল মান্নানের জন্মদিন

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

আড্ডার মূল সৌন্দর্য তার স্বতঃস্ফূর্ততা ও অনাড়ম্বরতায়। রাজধানী ঢাকায় কখনো কখনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনও প্রাণবন্ত আড্ডায় পরিণত হয়। তেমনই একটি সন্ধ্যা কাটল রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের পাঠক সমাবেশে।

ড. সরকার আবদুল মান্নানের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘শব্দে গাঁথা জীবন: সরকার আবদুল মান্নানের জন্মদিনের আড্ডা’। তবে আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রাণখোলা কথোপকথনই হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। গল্প, স্মৃতিচারণ ও নানা প্রসঙ্গে আলাপ করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ৯টা বাজে, তা উপস্থিত অনেকেই বুঝতে পারেননি। এরপরও যেন অনেকের বলার কথা রয়ে যায়।

অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অংশটুকুও ছিল বেশ প্রাণবন্ত। ড. সরকার আবদুল মান্নানের শিক্ষা-ভাবনা ও শিক্ষকসত্তা নিয়ে বক্তব্য দেন সাহিত্যিক ও শিক্ষক ঝর্না রহমান। একজন প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার সঙ্গে আনন্দের সংযোগের অভাবের কথা বলেছিলেন। সরকার আবদুল মান্নান সেই ঘাটতি পূরণে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় ও চৈতন্য-উদ্দীপক শিক্ষার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে চলেছেন।

ঝর্না রহমানের মতে, শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করা কিংবা শিক্ষকতার বিনিময়ে বেতন নেওয়াকেই মান্নান তাঁর দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি। বরং বইয়ের বাইরের বৃহত্তর জগতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটিয়ে তাঁদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি।

আলোচনায় শুধু শিক্ষাবিদ সরকার আবদুল মান্নানের প্রসঙ্গই উঠে আসেনি; তাঁর প্রাবন্ধিক ও শিশুসাহিত্যিক পরিচয়ও উঠে আসে। অনুষ্ঠানে শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে বই, ফুল ও উত্তরীয় উপহার দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।

ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় সিক্ত সরকার আবদুল মান্নান নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে পারিবারিক একটি স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর মা বলতেন—তাঁর বাবার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগত এবং মানুষ দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছে করত। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই স্বভাবই তিনি পেয়েছেন। এখনও মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ভালো লাগে এবং সুযোগ পেলেই তিনি রাস্তায় হাঁটেন।

নিজের জীবনকে স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন জন্মদিনের এই আয়োজনে। তাঁর সততা ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনচর্চার প্রশংসা করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি নাট্যজন ও লেখক খায়রুল আলম সবুজ।

তিনি বলেন, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেই লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হয়নি; বরং তৈরি হয়েছে মূলত চাকরিজীবী একটি শ্রেণি। সমাজে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকার আবদুল মান্নানের মতো মানুষের প্রয়োজন আরও বেশি।

রঙ্গে ভরা বঙ্গ, পুথিনিলয় ও পাঠক সমাবেশ যৌথভাবে এ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রহমান, কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার, অনুবাদক সৌম্য হায়াৎ, লেখক ড. হোসনে আরা, প্রকাশক শ্যামল পাল এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তায়েব মিল্লাত হোসেনসহ অনেকে।

বক্তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, ১৯৬৪ সালের ২১ জুলাই জন্ম নেওয়া শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. সরকার আবদুল মান্নান ভবিষ্যতেও দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাবেন।

আলোচনা ও আড্ডার পাশাপাশি ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সরদার হিরক রাজা ও তাপসী রায়। আবৃত্তি করেন জোবায়দা লাবণী। পুরো আয়োজন সঞ্চালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইমরান উজ-জামান ও শিক্ষক সাবিহা সুলতানা।

সব মিলিয়ে জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে আয়োজনটি পরিণত হয় স্মৃতি, ভালোবাসা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে এক আন্তরিক সন্ধ্যার আড্ডায়।

এমএজেড
আরও পড়ুন