রাস্তার মাস্টার॥ পর্ব-২ ॥ শারমিন রহমান

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০২:২৪ পিএম

শ্রীহীন ঘরটাকে আপন ভেবেই ভালোবাসা, যত্ন আর মমতা দিয়ে আভা সংসার শুরু করে। তার যত্নে বাড়িতে সৌন্দর্য ফিরতে শুরু করে। পুরোনো বাড়িটাও যত্নে হেসে ওঠে। হাসতে থাকে আভার কোল। প্রথম মেয়ের মা হয় আভা। এখন বয়সের সঙ্গে আভারানী হয়ে ওঠে সে। সোনাবরণ মেয়ের নাম রাখেন সোনালি। সোনা মেয়ে তাদের। সত্য নারায়ণকে এবার কাজের প্রতি একটু বেশি গুরুত্ব দিতে বলেন আভা। সংসার বড় হচ্ছে। বাবার দিনে দিনে বয়স বাড়ছে। কিন্তু সত্য নারায়ণ খুব বেশি কষ্টের কাজ করতে পারে না। বড্ড নরম মানুষ সে। পেটের ক্ষুধা তো আর কোনো যুক্তি মানে না। মেয়ে হওয়ায় আভা আর সত্যনারায়ণ খুশি হলেও বেশ নাখোশ হয়েছেন সত্য নারায়ণের বাবা-মা। মেয়ে মানেই একগুচ্ছ টাকার অপচয়। আভাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন শাশুড়ি ‘শোনো বউমা, তাড়াতাড়ি নাতির মুখ দেখাও আমাদের। প্রথমেই তো একটা অলক্ষুণে কাজ করলা। বংশের প্রথম বাচ্চা মেয়ে হওয়া অশুভ লক্ষণ। পূজোয় মন দাও, ঠাকুরকে ডাকো। ছেলে সন্তান দরকার।’ 

আভা ভয় পেতে শুরু করে। টানাটানির সংসার হলেও স্নেহ-মমতা দিয়ে ভরপুর ছিল সংসার। আভার কষ্ট হয়নি এ বাড়িতে এসে। যে নিশ্চিত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল আভা, তা পূরণ না হলেও ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে সে তা ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির আচরণ দিন দিন বদলে যেতে শুরু করে। আভার খুব মন খারাপ। মেয়ে কেন খারাপ বা অশুভ লক্ষণ, তার কারণ খুঁজে পায় না সে। ছেলে-মেয়ে হওয়া যদি মানুষের হাতে থাকতো তাহলে সবাই নিজের পছন্দমতো করে নিতে পারতো। আভার দোষটা কোথায়, সেটা সে বুঝে উঠতে পারে না। 

শ্বশুর মশাইয়ের বেশ শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। বাড়িতেই থাকেন এখন। সত্যনারায়ণ তেমন ভালো কোনো কাজ পায় না। যখন যে কাজে ডাকে মানুষ তাই করে। কষ্টের কোনো কাজ বা ভারী কাজ সত্যনারায়ণ করতে পারে না।

তার কাজ থেকে যে সামান্য টাকা আসে তা দিয়ে এখন খাবার ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আভা এখন দ্বিতীয় সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে যাচ্ছে। অভাব যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে। ধান কিনে আনা হয়েছে। চাল কিনে খাওয়ার থেকে ধান কিনে চাল করলে খরচ কম হয়। তাতে যদি একটুখানি সাশ্রয় হয় ক্ষতি কি। 

ধান সিদ্ধ করা, রোদে শুকানো, ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল বের করা এই সব কাজ আভাকে একার হাতে করতে হয়। এদিকে পুষ্টির অভাবে আভার শরীর ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে আরেকটা মানুষ। তার এখন বাড়তি খাওয়ার প্রয়োজন। অথচ পেটে ক্ষুধা রেখেই তাকে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। শ্বাশুড়ি সব কাজ আভাকে দিয়েই করায়। মেয়ে হওয়ার অপরাধের শাস্তি দেওয়া হয় তাকে এভাবেই। ধান সিদ্ধ করার সময় ধোঁয়ায় ঘর ভরে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে আভার। মনে হয় ফুসফুস দখল করে নিয়েছে ধান সিদ্ধের গন্ধ আর কালো ধোঁয়া। দৌড়ে বাইরে যায় আভা। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়। একটু স্বাভাবিক হতেই আবার উনুনের কাছে গিয়ে বসে। বসে বসে কাজ করতে গিয়ে পেটে ব্যথা করে আভার। পানি খায় বারেবার। এবার শরীর ছেড়ে দেয়। মনে হয় শরীরটাকে ভীষণ ভারী। শাড়ির আঁচল বিছিয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়ে। শ্বাশুড়ি এসে কাজের ফাঁকি দেখে রেগে যায়। ভীষণ গালিগালাজ করে আভাকে। আভা খুব কষ্টে শরীরটাকে তুলে বসে। বড় বড় মাটির কলস ধরিয়ে দেয় আভাকে। পুকুর থেকে জল তুলে আনতে পাঠায়। এভাবেই দিন কাটে আভার। মায়ের কথা মনে পড়ে ভীষণ। একটা মমতার হাত খুব পেতে ইচ্ছে করে মাথার ওপর। 

এত এত কষ্টের মাঝেও আভাকে ঘিরে থাকে অন্য এক আতঙ্ক। যদি এবার ছেলে না হয়, এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই গায়ে কাঁটা দেয়। আর কিছুই ভাবতে পারে না। এ বাড়িতে তার সঙ্গে যেমন ব্যবহার করা হয়, তার থেকে আরও খারাপ ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা জানে না সে। সংসারের অভাব মেটাতে গিয়ে দাদার কাছ থেকে পাওয়া মায়ের ছোট ছোট গয়নাগুলো একে একে সব বিক্রি করেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। কয়েকটা পিতলের থালাবাসন ছাড়া। সারাক্ষণ ঠাকুর দেবতাকে ডাকতে থাকে। তার একটা ছেলে চাই। ছেলে না হলে এ সংসারে তার আর জায়গা হবে না। আভার মনে অভিমান জমে। স্বামী সত্যনারায়ণ তার কষ্ট চোখে দেখেও কোনো কথা বলতে পারে না। রোজগার নেই, ভীতু মনুষটা নিজেই মেয়ে হওয়ার অপরাধে কুঁকড়ে থাকে সারাক্ষণ। 

অবশেষে সেই দিন এলো। আভার দ্বিতীয় মেয়ে জন্ম হলো। আঁতুড় ঘরে শাশুড়ি মা ঘেঁষলেন না। নাতনির মুখটাও দেখলেন না। সত্যনারায়ণ মাঝেমধ্যে আভার জন্য খাবারের থালাটা নিয়ে হাজির হতো। আভার পেটে যেন ক্ষুধা নামের হাঙর। অথচ খাবার পেতো এক বেলা। মুড়ি, চিড়া চিবাতে ভালো লাগে না। আভার তো ভাত খেতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু ভাত একবেলা যা পায় তাতেও পেটের অর্ধেক খালি থাকে। মেয়েটা বুকের দুধ পায় না। বাইরের দুধ কেনার কথা বলার সাহস নেই। সারারাত কাঁদতে থাকে শিশুটা। বুটকা ফেটে যায় আভার। কী পাপ করেছে ঠাকুর! এতটুকু মেয়েকে কেন শাস্তি দিচ্ছ? ঠাকুরকে ডেকে ডেকে গলা শুকিয়ে যায় তার। চোখের জল মুছে নেয় গোপনে।

চলবে...

আরও পড়ুন