পর্ব-০৪
দিশাহারা সত্য নারায়ন কী করবে ভেবে পায় না। নির্ঘুম রাত কাটে সত্য নারায়নের। আভা আঁচল চেপে কান্না লুকায়। সেদিন ছিল রবিবার। একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে কাজ করতে যায় সত্য নারায়ন। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। মনটা বিষন্ন। কোথায় যাবে সন্তানদের নিয়ে? এই এক চিন্তা তাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। হঠাৎ ফুলকাকু অর্থাৎ যাদবানন্দ নায়কের সঙ্গে দেখা হলো সত্য নারায়নের। যাদবানন্দ নায়ক সত্য নারায়নের বাবার খুড়তুতো ভাই। ফুলকাকু সত্য নারায়নের চিন্তিত মুখ দেখে জানতে চায় কেমন চলছে দিনকাল। সত্য নারায়ন তাকে জানায় একটা থাকার জায়গা তার ভীষণ দরকার। যাদবানন্দ যেন সত্য নারায়নের কথা শুনে খুশি হয়ে ওঠে।
নন্দীতে যাদবানন্দের যে বাড়ি সেখানে দীর্ঘদিন কেউ থাকে না। বড্ড খারাপ অবস্থা সেখানকার। জঙ্গলের মধ্যে বাড়ি বলে কেউ থাকতে চায় না সেখানে। কয়েকদিন আগে খবর পেয়েছে বাড়ির জানালা খুলে নিয়েছে চোর। বড্ড চিন্তায় আছে যাদবানন্দ সেই থেকে। একজন পাহারাদার রাখতে গেলেও খরচ অনেক। তাছাড়া জঙ্গলের মধ্যে বাড়িতে কেউ থাকতেও রাজি হয় না। এমন সময় সত্য নারায়নের কথায় যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো সে। কিন্তু মুখে তার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। একটা ভাবলেশহীন চেহারা করে সত্য নারায়নকে ভারিক্কি গলায় বললেন, ‘আমার বাড়িটা তো পড়েই আছে, ওখানে এসে থাকতে পারো। নিজের মনে করে গুছিয়ে নিতে হবে কিন্তু!!
সত্য নারায়ন যেন পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলো। সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে যখন কোনো নাবিক পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায় বা কোনো অবলম্বন খুঁজে পায় ঠিক তেমন। ঠাকুরকে মনে মনে কোটিবার প্রণাম করে সত্য নারায়ন। শুরু হলো অন্যরকম ব্যস্ততা। ফুল কাকুর বাড়িটা জঙ্গলে সেটা জানতো সত্য নারায়ন কিন্তু বাড়িটা যে অনাদরে নিজেই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে সেটা জানতো না। কী আর করার! মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে এই তো অনেক। শুরু হলো বাড়ি পরিষ্কারের কাজ। বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার হেঁটে এসে বাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতে শুরু করলো সত্য নারায়ন। কিন্তু একা একা কতোদিন বসে আর এই জঙ্গল পরিষ্কার করবে সে!
এদিকে বস্তি ছাড়ার জন্য চাপ যেন বেড়েই চলেছে। এবার আভা তার তিন মেয়েকে সঙ্গে করে সত্য নারায়নের সঙ্গে জঙ্গল পরিষ্কার করতে আসলো। ছোট মেয়ে কাবেরীকে বেবির কোলে দিয়ে বসিয়ে রাখলো বাড়ির এককোনে। এরপর স্বামীর সঙ্গে হাত লাগালো আভা। সোনালীর কাছে এটা খুবই আনন্দের কাজ। নতুন বাড়িতে থাকবে তারা। বড় একটা বাড়ি। চুন সুরকি দিয়ে তৈরি করা বড় একটা ঘর। পাশেই মাটির একটা মাঝারি ঘর। মাটির ঘরটাতে সত্য নারায়নের পরিবার থাকবে। বড় ঘরটি পরিষ্কার করে রাখা হবে ফুল কাকুর জন্য। ছুটিতে এসে থাকবেন তিনি। ১০-১৫ দিন টানা কাজ করার পর বাড়িটি মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠলো। সত্য নারায়ন বস্তির পাঠ চুকিয়ে ফুল কাকুর বাড়িতে সংসার সাজিয়ে থাকতে শুরু করে। আভা আর সত্য নারায়নের নতুন সংসার।
চলবে
