এক-এগারোর নেপথ্যে সাবেক সেনাপ্রধান ও দুই সম্পাদক

মুখ খুললেন মাসুদ উদ্দিন ও মামুন খালেদ

আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অসাংবিধানিক ও অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অপরাধে তৎকালীন কুশীলবদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হবে এবং আগামী ঈদুল আজহার পরপরই এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এক-এগারো সরকারের আমলে সংঘটিত অমানবিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নেপথ্যের অন্যতম মূল নায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

সূত্র জানায়, এক-এগারো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে মূলত তাঁদের এক-এগারোর পটভূমি ও ষড়যন্ত্রের বিষয়েই বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত কর্মকর্তারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন এবং তাঁদের বক্তব্য থেকে সে সময়ের ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এক-এগারো ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে তিনজনের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়েছে, দুই সম্পাদকই ছিলেন মূলত এক-এগারোর মূল পরিকল্পনাকারী এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুশীল সমাজের যোগসূত্র রক্ষাকারী। তাঁদের পরামর্শেই তৎকালীন ফখরুদ্দীন আহমদের উপদেষ্টামণ্ডলী গঠিত হয়েছিল এবং তাঁরাই ছিলেন সরকারের মূল নীতিনির্ধারক।

রিমান্ডে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, সুশীল সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে একটি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে লবিং করেছিল। এর অংশ হিসেবে দেশে কৃত্রিম রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়।

তিনি দাবি করেন, শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন খবর পাওয়ার পরই সশস্ত্র বাহিনী শেষ মুহূর্তে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। তারা পরিকল্পনার অংশ ছিল না, কেবল বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, তৎকালীন সময়ে দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক সুপরিকল্পিতভাবে রাজনীতিবিদদের প্রতি জনমনে ঘৃণা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের নামে দেশব্যাপী সেমিনার ও গোলটেবিল বৈঠক করে ‘বিরাজনীতিকরণ চেতনাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হয়।

তদন্তকারীদের তথ্যমতে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে চিরতরে মাইনাস করার যে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা, তা বাস্তবায়নে এই মিডিয়া গ্রুপটি গণমাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করেছিল। পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি এবং ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের প্রমোট করার পেছনেও তাঁদের ভূমিকা ছিল। তৎকালীন সময়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ অন্যান্য রাজবন্দীদের ওপর রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতন চালানো হলেও, এই পত্রিকাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিকে এড়িয়ে গিয়ে বিরাজনীতিকরণের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, ক্ষমতা দখলের মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি, উক্ত দুই সম্পাদক সেনা সদরে তৎকালীন সেনাপ্রধানের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোপন বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। এমনকি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পদ থেকে ইয়াজউদ্দিন আহমদের সরে দাঁড়ানোর যে লিখিত ভাষণটি পাঠ করা হয়েছিল, সেটিও সুশীল সমাজের ওই মুখপত্রের সম্পাদক লিখে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং জেনারেল মামুন খালেদ উভয়েই তদন্তকারীদের নিশ্চিত করেছেন যে, এক-এগারোর নেপথ্যের প্রকৃত রহস্য দুই সম্পাদকের কাছে রয়েছে এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পুরো সত্য উদ্ঘাটিত হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী মাসের শুরুতেই এক-এগারো আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

YA
আরও পড়ুন