সব সরকারি কর্মকর্তাই কী চোর?

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর’; আর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের কাজের মধ্যে ‘কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা’ রয়েছে।

তবে দুই বক্তব্যই সংশ্লিষ্ট বক্তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ। দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত—এমন কোনো তথ্য এসব বক্তব্যে উপস্থাপন করা হয়নি।

গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

সেখানে তিনি দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে ঘুষ ও লুটপাটের অভিযোগ তোলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দেশের পরিস্থিতিকে ‘অদ্ভুত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ ও লুটপাটে জড়িত। তাঁর দাবি, এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

স্পিকার আরও বলেন, বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের বিচার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনগণের দাবির অপেক্ষা না করেই হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বছরের পর বছর অভিযোগ ও দাবির পরও অনেক অপরাধের বিচার হয় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সভায় ফিলিপাইনের উদাহরণও টানেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশে একই ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিচার হয়নি।

‘সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা’

এর দুই দিন পর, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) লক্ষ্মীপুরে সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় একই ধরনের প্রসঙ্গ ওঠে।

সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের কাজ হলো বক্তৃতা দেওয়া। সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ হলো কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা, এক তালে যাবে না এটা।’

মন্ত্রী একই বক্তব্যে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি এমন একটি সমাজ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থবহ জীবনযাপন করতে পারবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পাশাপাশি দুর্নীতি দমনও দায়িত্বের অংশ। তাঁর ভাষ্য, দুর্নীতি সমাজে আছে এবং তা প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষ্মীপুরের সভায় মন্ত্রী আরও বলেন, দুর্নীতি কে করে তা তিনি জানেন না; তবে সমাজে দুর্নীতি রয়েছে। কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে কেউ অর্থ নিলে তা সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই হতে পারে—এমন উদাহরণ দিয়ে তিনি দুর্নীতি প্রতিরোধে কর্মকর্তাদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও তা প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর মতে, দুর্নীতি কমানো বা বাড়ানো—এই মাত্রার পার্থক্য রয়েছে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

দুই দিনের ব্যবধানে দুই বক্তব্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—সব সরকারি কর্মকর্তা কি দুর্নীতিতে জড়িত?

বক্তাদের বক্তব্যে ‘অধিকাংশ’ বা ‘কিছু’ সরকারি চাকরিজীবীর কথা বলা হলেও এসব বক্তব্য থেকে দেশের পুরো সরকারি প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। সরকারি ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্ত ও মামলা থাকতে পারে; আবার বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালনও করেন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—দুর্নীতির সুযোগ কোথায় তৈরি হচ্ছে, নজরদারি কতটা কার্যকর, এবং অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষ।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও লুটপাটের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগের কার্যকর তদন্ত, সম্পদের হিসাব, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সেবা প্রদানে জবাবদিহি এবং দুর্নীতির ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ই প্রশাসনিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লক্ষ্মীপুরের সভায় মন্ত্রী নিজেও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। আর ভোলায় স্পিকার বিচার না হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

দুই বক্তব্যের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কার্যকর জবাবদিহি। অভিযোগ যদি থাকে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে; অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দোষ কর্মকর্তাদেরও যেন সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত করা না হয়, সেটিও প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন