জাতীয় পেনশন পর্ষদ সভা আজ, আসছে যেসব পরিবর্তন

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন চাঁদা দিতে না পারা গ্রাহকদের জন্য ‘এক্সিট প্ল্যান’, শরিয়াহভিত্তিক ‘ইসলামী উইন্ডো’ চালু, পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা এবং পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার মতো একাধিক প্রস্তাব উঠছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায়।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। পদাধিকারবলে তিনি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। সভার আলোচ্যসূচিতে এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যেসব বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন, সেগুলো অর্থমন্ত্রীর দপ্তরে উপস্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সভায় আলোচনা শেষে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধনকারী তিন লাখ ৭৯ হাজার ৩২৭ জন। বর্তমানে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণভাবে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে আজীবন মাসিক পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী কেউ বিশেষ বিবেচনায় স্কিমে যুক্ত হলে নির্ধারিত সময় চাঁদা দেওয়ার পর পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

চাঁদা দিতে না পারলে বের হওয়ার সুযোগ

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে নিষ্ক্রিয় হিসাব। বর্তমানে পেনশনযোগ্য বয়সে পৌঁছানোর আগে স্বেচ্ছায় স্কিম থেকে বেরিয়ে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সাধারণ সুযোগ নেই। মৃত্যু বা সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার মতো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া পেনশনযোগ্য বয়সের আগে স্কিম বন্ধ করে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই।

এ অবস্থায় দীর্ঘদিন চাঁদা দিতে না পারা গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ‘এক্সিট প্ল্যান’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। আলোচ্যসূচি অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক অন্তত ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে আর চাঁদা চালিয়ে যেতে না পারলে বিশেষ বিবেচনায় তাঁর জমাকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার সুযোগ রাখা হতে পারে।

তবে ফেরতের পরিমাণ, মুনাফা কীভাবে হিসাব হবে এবং স্কিম থেকে বেরিয়ে গেলে ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধার কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পর্ষদের অনুমোদনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা তৈরি হতে পারে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এক্সিট প্ল্যান। কেউ চাঁদা দিতে অক্ষম হলে যাতে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা থাকে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শরিয়াহভিত্তিক ‘ইসলামী উইন্ডো’

সর্বজনীন পেনশন চালুর পর থেকেই শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ও পেনশন ব্যবস্থার দাবি ছিল বিভিন্ন মহলে। এবার শরিয়াহ অনুসরণে আগ্রহী নাগরিকদের জন্য আলাদা ‘ইসলামী উইন্ডো’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন কাঠামোর মধ্যেই ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিনিয়োগ ও মুনাফা ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এমন ব্যবস্থা চালু হলে পেনশন ব্যবস্থায় এখনো যুক্ত না হওয়া অনেক নাগরিককে আকৃষ্ট করা সম্ভব হতে পারে।

এর আগে চারটি স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ চালুর উদ্যোগের কথা জানা গিয়েছিল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছিল জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন প্রস্তাবে আলাদা স্কিমের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে ‘ইসলামী উইন্ডো’ চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

৬০ নয়, ৫৫ বছরেই পেনশন?

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সাধারণভাবে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে মাসিক পেনশন পাওয়ার কথা। এবার সেই বয়স পাঁচ বছর কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে গ্রাহকদের পেনশনের জন্য অপেক্ষার সময় কমবে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে স্কিমে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার বিষয়টি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে; এটি বর্তমান নিয়ম নয়।

পেনশনারের মৃত্যুর পর আজীবন পেনশন

বর্তমান নিয়মে পেনশনার ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশন পান। অর্থাৎ পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীর আজীবন পেনশন পাওয়ার সুযোগ নেই।

এই নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৭৫ বছর বয়স অতিক্রম করা পেনশনারদের জন্য অতিরিক্ত বা বিশেষ সুবিধার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

জমার বিপরীতে ঋণ, বাড়তে পারে কমিশন

পেনশন হিসাবে জমা অর্থের বিপরীতে ঋণ সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়েও সভায় আলোচনা হতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় একজন চাঁদাদাতা তাঁর জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন।

নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কমিশন ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই হারে ব্যাংক, ডাক বিভাগ এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কমিশন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

আস্থার সংকট কাটানোই বড় চ্যালেঞ্জ

সর্বজনীন পেনশন চালুর শুরুতে মানুষের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও পরে নিবন্ধনের গতি কমে যায়। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি স্কিমে নিবন্ধনকারী দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৩২৭ জন।

কর্তৃপক্ষ মনে করছে, শুধু নতুন গ্রাহক বাড়ানো নয়, এরই মধ্যে নিবন্ধিতদের নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য নিষ্ক্রিয় গ্রাহকদের জন্য এক্সিট প্ল্যান, শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ, পেনশনারের পরিবারের সুবিধা বাড়ানো, পেনশনের বয়স কমানো এবং নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ সামনে আনা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, আগের সময়ে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট কাটাতে একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পাওয়ার পর এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।

এমইউ
আরও পড়ুন