রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে ৩০ বাংলাদেশি, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম দিনেই নিহত ১৭

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। বিশেষায়িত বাহিনী স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন ১৭ বাংলাদেশি। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। তাঁরা হলেন জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) এবং আবু তাহের ওরফে লেন্টু (৫০)। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সম্প্রতি ঢাকার কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. আসাদুজ্জামান।

নির্মাণশ্রমিকের চাকরির কথা বলে নেওয়া হয় রাশিয়ায়

এসআরবির প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্তত ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর তাঁদের রুশ সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে এসআরবি।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশিদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে মোতায়েন করা হয়। পর্যাপ্ত সামরিক প্রস্তুতি ছাড়াই তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বলে মনে করছে তদন্তকারী বাহিনী।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম দিনেই নিহত ১৭

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। পরে পাওয়া তথ্যসহ এ ঘটনায় মোট ২০ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে বাহিনীটি।

বাকি ব্যক্তিদের বিষয়ে এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন, দুজন দেশে ফিরে এসেছেন এবং আরও দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে এসব ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা ও পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিরা যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা, কৌশলগত প্রস্তুতি কিংবা সামরিক প্রশিক্ষণ কোনোটিই পর্যাপ্ত ছিল না।

‘শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্তে টোপ হিসেবে ব্যবহার’

এসআরবির প্রাথমিক মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাংলাদেশিদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাঁদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে তদন্তকারী সংস্থাটি।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষের ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার সূত্র ধরে হামলাকারী পক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এটি এসআরবির প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে করা মূল্যায়ন। বাংলাদেশিদের এ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

মানব পাচার চক্রের অন্য সদস্যদের খোঁজ

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান ও আবু তাহেরের বিরুদ্ধে কী কী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। তদন্তকারী বাহিনী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

চাকরির আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের এমন পরিণতি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এএম
আরও পড়ুন