সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর নতুন করে সামনে এসেছে দেশটিতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, বিচারপ্রাপ্তি এবং কূটনৈতিক সুরক্ষার প্রশ্ন। দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, কী ধরনের প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা ছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল কি-না এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর এখন জরুরি।

একই সঙ্গে সামনে আসছে আরও দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক বিষয়। সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া বহু বাংলাদেশি নারী বছরের পর বছর ধরে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, বেতন না পাওয়া, আটকে রাখা এবং নিয়োগকর্তার কাছ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের কেউ দেশে ফিরেছেন, কেউ বিদেশের মাটিতেই মারা গেছেন। এসব ঘটনায় অভিযোগের তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, সেই প্রশ্নও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওকে কেন্দ্র করে মামলার সূত্রপাত হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা, প্রেক্ষাপট, কীভাবে সেটি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং সেটির পাশাপাশি অন্য কী প্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি-না, তারা আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি-না এবং আপিলের সুযোগ ছিল কি-না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের প্রকৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া ও প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা।

এ ঘটনায় আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে- মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানানো হয়েছিল কি-না। বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ, নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে বিচারপ্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং মানবাধিকার-বিষয়ক প্রতিবেদনে নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বেতন আটকে রাখা ও কর্মস্থলে বন্দি করে রাখার অভিযোগ উঠে এসেছে।

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা হাজারো নারী শ্রমিকের মধ্যে অনেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কথা জানান। ২০১৯ সালের আগস্টে দেশে ফেরা ১১০ জন নারীকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ৩৫ শতাংশের শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৮ জন দুই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ৪৮ জনের নিয়মিত বেতন না পাওয়ার কথাও উঠে আসে।

এই পরিসংখ্যানগুলো নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা ও ফেরত আসা শ্রমিকদের নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হচ্ছে। এগুলোকে সৌদি আরবে কর্মরত সব বাংলাদেশি নারীর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা যাবে না। তবে অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের গুরুত্ব বোঝার জন্য এসব তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান, কিন্তু তদন্তের ফল কোথায়?

২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের মরদেহ দেশে ফেরত আসার তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তৎকালীন একাধিক প্রতিবেদনে ওই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৪৭৩ নারীর মরদেহ দেশে আসার কথা বলা হয়; এর মধ্যে ১৭৫টি সৌদি আরব থেকে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সময়সীমা নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।

আল জাজিরা ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ বাংলাদেশি নারীর মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। প্রতিবেদনে তাদের মধ্যে ৫২ জনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব মৃত্যুর সবগুলোর পেছনে নির্যাতন ছিল এমন সিদ্ধান্ত শুধু পরিসংখ্যান থেকে টানা যায় না। প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ জরুরি। একইভাবে, আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে তার আগে নির্যাতন, হুমকি বা জবরদস্তি ছিল কি-না, তা খতিয়ে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়; কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশে কর্মস্থলে নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর পর মারা গেলে সেই অভিযোগের তদন্ত কীভাবে হয়? মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরিবারের সন্দেহ থাকলে তারা কি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদন্তের সুযোগ পান? অভিযুক্ত নিয়োগকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত তথ্য।

আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতা: নির্যাতনের অভিযোগের পর নিরাপত্তা কোথায়?

২০১৯ সালে বিবিসি সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশি নারী আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, রিয়াদে প্রায় দেড় বছর থাকার সময় তাকে যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। আমেনা বিবিসিকে বলেছিলেন, একপর্যায়ে তাকে টানা তিন দিন খাবার দেওয়া হয়নি। পরে মারধরে তার হাত ভেঙে যায় এবং তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। চিকিৎসার পর এজেন্টের মাধ্যমে তাকে আবার একই বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। সেখানে ফিরে যাওয়ার পরও শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চলেছিল বলে তার বক্তব্য।

আমেনা আরও জানিয়েছিলেন, প্রায় এক বছর কাজ করেও তিনি মাত্র দুই মাসের আংশিক বেতন পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবার বাসা থেকে বের করে দেওয়া হলে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয় এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা হয়। আমেনার বক্তব্য একজন নির্যাতনের অভিযোগকারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। তবে তার অভিযোগের ভিত্তিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ কী তদন্ত করেছিল, কোনো মামলা হয়েছিল কি-না এবং অভিযুক্ত নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি-না এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া বিচারিক ফল সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা যায় না।

তবু এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে- নির্যাতনের অভিযোগ জানানো একজন নারীকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বদলে যদি আবার অভিযোগ ওঠা কর্মস্থলে পাঠানো হয়, তবে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

সালমা বেগমের বোনের মৃত্যু: পরিবারের সন্দেহের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?

বিবিসির আরেক প্রতিবেদনে খুলনার সালমা বেগম তার ছোট বোনের মৃত্যুর বিষয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছিলেন। সালমার বক্তব্য অনুযায়ী, তার বোন সৌদি আরবে এক পরিবারের বাসা থেকে পালিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। পরে তাকে আবার ওই পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং এরপর তার মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানতে পারে। সালমা জানিয়েছিলেন, তার বোনের মৃত্যু হয়েছিল ৪ মার্চ, কিন্তু মরদেহ দেশে পেয়েছিলেন ২০ জুলাই। মৃত্যুর সনদে হৃদ্‌রোগের কথা উল্লেখ থাকলেও মরদেহের মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন এবং শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে তিনি দাবি করেছিলেন।

এটি পরিবারের অভিযোগ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত, ময়নাতদন্তের নথি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। তবে পরিবারের এমন অভিযোগ থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজনে পুনঃতদন্তের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশে কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হলে পরিবার শুধু মরদেহ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে না; তারা জানতে চায়, কী ঘটেছিল এবং কেউ দায়ী হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি-না।

শরিয়া আইন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ইসলামী আইন ও দেশটির নিজস্ব আইনগত কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তবে কোনো দেশের আইনকে কেবল একটি শব্দ বা পরিচয়ের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। বাস্তবে আইন কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে কি-না, অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন কি-না এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি-না এসব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

যৌন নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন, জবরদস্তি, অবৈতনিক শ্রম কিংবা হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নাগরিকত্ব বা আর্থিক অবস্থান যেন তদন্ত ও বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করাও জরুরি।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় যদি বিচারপ্রক্রিয়া বা কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একইভাবে, বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও বিচারের তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি। একটি ঘটনার বিচার দাবি করতে গিয়ে অন্য ঘটনার ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন আড়াল করা যায় না।

বাংলাদেশের করণীয় কী?

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের নথি সংগ্রহ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

জেএম
আরও পড়ুন