নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অবাক করা বিষয় হল যেসব প্রার্থী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তারাই শেষ হাসি হাসতে পারেননি।
এসব প্রার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী: নির্বাচনে সবার নজরে ছিল রাজধানীর ঢাকা-৮ আসন। এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
প্রচারণার সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আসেন তিনি। মির্জা আব্বাসের সমালোচনা করে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে দেশের মানুষের মন কাড়েন তিনি।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভোররাত ৪টার দিকে এ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে দেশের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচনায় থাকা ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পাঁচ হাজার ভোটে হারিয়ে মির্জা আব্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সারজিস আলম: জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সারজিস আলম। হেরে গিয়েও রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সারজিস আলম। পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর তিনি বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান। ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সম্পাদক সারজিস আলম শাপলাকলি প্রতীকে পান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।
তাসনিম জারা: জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ক্লিন ইমেজের অধিকারী এনিসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনীম জারা বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় ছিলেন। তবে জামায়াত জোটে এনসিপি প্রবেশ করায় তিনি পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ঢাকা-৯ আসনে হাবীবুর রহমানের বিপক্ষে পরাজয় বরণ করেন তাসনীম জারা। এ আসনে তিনি ফলাফলের দিক থেকে তিন নম্বরে ছিলেন।
মামুনুল হক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত মাওলানা মামুনুল হকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে।
এ আসনে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের নেতা মামুনুল হক। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে বিনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট। অপরদিকে ৮৬ হাজার ৬৭টি ভোট পেয়েছেন মামুনুল হক। তাদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৩২০। যদিও ভোর রাতে মাওলানা মামুনুল হক নির্বাচনের ফলাফল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন।
আমিনুল হক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীর্ষের প্রার্থী ছিলেন আমিনুল হক। তিনি বিগত সময়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সরব। জেল-জুলম নির্যাতনের পাশাপাশি জনপ্রিয়তার কারণে জয়ের ব্যাপারে ছিলেন আশাবাদী। তবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেনের কাছে তিনি পরাজিত হন।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা-১৬ আসনের ১৩৭টি কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আব্দুল বাতেন মোট ভোট পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮২৩টি। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম পেয়েছেন মোট ৮৪ হাজার ২০৭ ভোট।
মিয়া গোলাম পরওয়ার: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। হেবিওয়েট হয়েও খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া–ফুলতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) এর নিকট ২ হাজার ৭০২ ভোটে পরাজিত হন।
ধানের শীষ প্রতীকে মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ ভোট। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৭০২।
মোহাম্মদ শিশির মনির: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে সবেচেয়ে ক্লিন ইমেজ ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও হেরে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জৌষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। নেটিজেনদের ধারণা ছিল জামায়াতের একজন প্রার্থী জয় হলে সেটি হবে শিশির মনির।
কিন্তু বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফলে ৩৯ হাজার ৯৩২ ভোট বেশি পেয়ে বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী জয় লাভ করেছেন। বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৫৮ ভোট।
হামিদুর রহমান আজাদ: কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ হেরে গেছেন। তার নিকটতম প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।
১২৪ কেন্দ্রের ফলাফলে আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট। হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট।
হারুনুর রশীদ হারুন: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ হারুনকে হারিয়ে জয় তুলে নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নুরুল ইসলাম বুলবুল পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকে হারুনুর রশীদ পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট।
মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম: বরিশাল-৫ (সিটি-সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) এ দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম।
এরমধ্যে বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের চেয়ে ৪০ হাজার ১০২ ভোট কম পেয়েছেন। মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট ও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। একইভাবে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খানের চেয়ে ২৬ হাজার ২২৯ ভোট কম পেয়েছেন। আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট ও ফয়জুল করিম ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

