হজরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে বনি ইসরায়লের সমুদ্র পার হওয়ার অলৌকিক ঘটনাটির সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা- নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হলে সমুদ্রের পানি একদিকে সরে গিয়ে তলদেশের কোনো অংশ সাময়িকভাবে উন্মুক্ত হতে পারে। এতে মানুষের হেঁটে পার হওয়ার মতো একটি পথ তৈরি হওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র এবং সাম্প্রতিক কম্পিউটার মডেলিংয়ের আলোচনায় এ সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। জেরুজালেম পোস্টের ২০২৫ সালের ১০ মার্চের এক প্রতিবেদনে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক নাথান পালডরের গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। অধ্যাপক নাথান পালডরের হিসাব অনুযায়ী, সুয়েজ উপসাগরের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণমুখী প্রবল বাতাস প্রায় এক দিন ধরে প্রবাহিত হলে পানি সমুদ্রের অন্য অংশের দিকে সরে যেতে পারে। এতে আগে পানির নিচে থাকা সমুদ্রতল উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তার হিসাব অনুযায়ী, ঘণ্টায় প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হলে পানির স্তর প্রায় তিন মিটার নেমে যেতে পারে। এতে উপকূল থেকে প্রায় এক মাইল পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পানির নিচে থাকা একটি উঁচু ভূমির ওপর দিয়ে মানুষ হেঁটে পার হতে পারে। কম্পিউটার মডেলিংয়েও এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মডেল অনুযায়ী, ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগে সঠিক দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হলে পানির মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি পথ তৈরি হতে পারে। ওই পথে মানুষ শুকনো ভূমির ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
বিজ্ঞানীদের এই ব্যাখ্যা নিয়ে একটি প্রশ্ন রয়েছে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের এক্সোডাস বা যাত্রাপুস্তকের ১৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ঈশ্বর সারা রাত প্রবল পূর্বা বাতাস প্রবাহিত করে সমুদ্রের পানি সরিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে পালডরের হিসাব অনুযায়ী, সুয়েজ উপসাগরের ওই এলাকায় উত্তর-পশ্চিম দিকের বাতাস এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এ পার্থক্যের ব্যাখ্যায় তিনি প্রাচীন হিব্রু শব্দ ‘রুয়াহ কাদিম’-এর উল্লেখ করেছেন। তার মতে, শব্দটির অর্থ কেবল পূর্বদিকের বাতাস নয়; উত্তর-পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বাতাসও বোঝাতে পারে। তবে প্রাচীন ভাষার শব্দটির অর্থ ও বাতাসের দিক নিয়ে ব্যাখ্যাটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
জোয়ার-ভাটার ভূমিকার সম্ভাবনা
আরেকটি ব্যাখ্যায় বিজ্ঞানীরা জোয়ার-ভাটার প্রভাবের কথা বলেছেন। লোহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে কিছু এলাকায় জোয়ারের পানি নেমে গেলে সমুদ্রের তলদেশের অংশবিশেষ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ব্রুস পার্কারের মতে, মুসা (আ.) ওই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জোয়ার-ভাটার ধরন সম্পর্কে জানতেন, এমন সম্ভাবনা রয়েছে। তার ধারণা, চাঁদের অবস্থান ও জোয়ারের সময় সম্পর্কে প্রাচীন জ্ঞান ব্যবহার করেও অগভীর জলপথ পার হওয়া সম্ভব ছিল।
নেপোলিয়নের সৈন্যদেরও পার হওয়ার ঘটনা
সমুদ্রের পানি সরে গেলে স্থলপথে সুয়েজ উপসাগর পার হওয়া যে ভৌতভাবে অসম্ভব নয়, তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিসর অভিযানকে উল্লেখ করা হয়। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, নেপোলিয়নের অভিযানের সময় তার একদল সৈন্য জোয়ারের পানি কমে গেলে ঘোড়ায় চড়ে সুয়েজ উপসাগরের একটি অংশ পার হয়েছিল। তবে পানি দ্রুত ফিরে আসায় তারা বিপদের মুখে পড়েন। নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত সচিব লুই-অঁতোয়ান ফভেলে দ্য বুরিয়েনের স্মৃতিকথায় এ ধরনের একটি পারাপারের উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৯৯২ সালে বুলেটিন অব দ্য আমেরিকান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটি সাময়িকীতে সমুদ্রবিজ্ঞানী ডোরন নফ ও নাথান পালডর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তারা প্রবল বাতাসের কারণে সমুদ্রের পানি উপকূল থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরেন। এ প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘উইন্ড সেটডাউন’ বলা হয়। গবেষকেরা আরেকটি সম্ভাবনা হিসেবে সুনামির কথাও বিবেচনা করেছিলেন। তবে তাদের বিশ্লেষণে প্রবল বাতাসের কারণে পানি সরে যাওয়ার ব্যাখ্যাটি বাইবেলের বর্ণনার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
তবে গবেষণাটি মুসা (আ.)-এর সমুদ্র পার হওয়ার ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে ঘটেছিল, এমন প্রমাণ দেয় না। এটি কেবল দেখায়, নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে সমুদ্রের পানি সাময়িকভাবে সরে গিয়ে স্থলপথ উন্মুক্ত হওয়া প্রাকৃতিকভাবে সম্ভব। ঘটনাটির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলাদা আলোচনার বিষয়।
আমাকে সরাতে গেলে ডেমোক্রাটরাই ধ্বংস হয়ে যাবে: ট্রাম্প
ইরানকে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা দিচ্ছে রাশিয়া
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল এশিয়ায় কী প্রভাব ফেলতে পারে?
খার্গ দ্বীপে বিমান হামলার সতর্কসংকেত পরীক্ষা করবে ইরান