চাঁদের দেশে মানুষের প্রত্যাবর্তন

নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের শিহরণ জাগানো ১০ দিন

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানবজাতি আবার চাঁদের দেশে ফিরছে। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো মিশনের পর এবারই প্রথম মানুষ পৃথিবী থেকে এত দূরে মহাকাশে পাড়ি জমাতে যাচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘আর্টেমিস ২’ মিশনটি কেবল একটি মহাকাশ যাত্রা নয়, এটি ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটি বা ‘মুন বেস’ তৈরির প্রথম সোপান। আগামী ১ এপ্রিল এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, এই উচ্চাভিলাষী মিশনের প্রতিটি ধাপ এবং চার মহাকাশচারীর জীবন কেমন হবে মহাকাশে।

দানবীয় রকেট: স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS)

ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ৩২২ ফুট (৯৮ মিটার) লম্বা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট ‘এসএলএস’-এ চড়ে মহাকাশে যাবেন এই চার যাত্রী। এই রকেটটি ৩০ লক্ষ লিটারের বেশি তরল হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন জ্বালানি ব্যবহার করে মহাকাশে উড়াল দেবে। রকেটের একেবারে উপরে থাকবে ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান, যার ভেতরে থাকবেন চারজন অভিযাত্রী। যদি উৎক্ষেপণের সময় কোনো গোলযোগ দেখা দেয়, তবে শীর্ষে থাকা ‘লঞ্চ অ্যাবোর্ট সিস্টেম’ মুহূর্তেই মহাকাশচারীদের নিরাপদে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে।

আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিন মার্কিন এবং এক কানাডীয় মহাকাশচারী।

রিড ওয়াইজম্যান (কমান্ডার): নৌবাহিনীর এই প্রবীণ সদস্যের ১৬ বছরের মহাকাশ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, আকাশ জয় করতে ভালোবাসলেও রিড ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চতাকে ভয় পান!
ভিক্টর গ্লোভার (পাইলট): তিনি ওরিয়ন মহাকাশযানের চালক হিসেবে থাকবেন। সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীন তার নাম ছিল ‘IKE’ (আই নো এভরিথিং)।
ক্রিস্টিনা কোচ (মিশন স্পেশালিস্ট): প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে হাঁটার (স্পেসওয়াক) ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এবার তিনি চাঁদের পথে পাড়ি জমানো প্রথম নারী হতে চলেছেন।
জেরেমি হ্যানসেন (স্পেশালিস্ট): কানাডীয় এই মহাকাশচারী এবারই প্রথম মহাকাশে যাচ্ছেন। নিজের সাথে তিনি নিয়েছেন প্রিয় মেপল সিরাপ এবং কুকিজ।

মিনিবাসের সমান ঘর: মহাকাশে ১০ দিন

মহাকাশচারীরা টানা ১০ দিন ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে কাটাবেন, যার আয়তন মাত্র একটি ছোট মিনিবাসের সমান (১৫ ফুট চওড়া ও ৯ ফুট উঁচু)। এই অল্প জায়গায় তাদের ঘুমানো, ব্যায়াম, খাবার এবং কাজ করতে হবে।

শৌচাগার: অ্যাপোলো মিশনের মতো এবার আর মহাকাশচারীদের কষ্ট করতে হবে না। ওরিয়নে রয়েছে অত্যাধুনিক টয়লেট। তবে সেখানে কোনো গোপনীয়তা নেই, টয়লেটের প্রতিটি শব্দ বাকি তিন সহযাত্রী শুনতে পাবেন!

ব্যায়াম ও খাবার: পেশি ঠিক রাখতে তাদের প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে বিশেষ যন্ত্রে ব্যায়াম করতে হবে। প্রত্যেকেই তাদের পছন্দসই খাবার সাথে নিয়েছেন।

মিশনের প্রথম দিনে তারা পৃথিবীর প্রায় ৭০,০০০ কিলোমিটার উপরে অবস্থান করে মহাকাশযানের সব সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এরপর শুরু হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন’। ওরিয়নের প্রধান ইঞ্জিন গর্জে উঠে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল কাটিয়ে চাঁদের পথে ছুটবে।

চাঁদে পৌঁছাতে সময় লাগবে কয়েক দিন। তারা চাঁদের অন্ধকার অংশে (যা পৃথিবী থেকে দেখা যায় না) পৌঁছালে পৃথিবী থেকে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিনিটের জন্য। ওরিয়ন তখন চাঁদ থেকে মাত্র ৬,৫০০ থেকে ৯,৫০০ কিলোমিটার দূরে থাকবে। এই তিন ঘণ্টা তারা খুব কাছ থেকে চাঁদের ভূতাত্ত্বিক ছবি তুলবেন এবং গবেষণা করবেন।

চাঁদকে প্রদক্ষিণ শেষে তারা আবার পৃথিবীর দিকে যাত্রা শুরু করবেন। ফেরার পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ওরিয়ন যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তখন এর গতি হবে ঘণ্টায় ২৫,০০০ মাইল। বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা হবে ২,৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস—যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার অর্ধেক!

ওরিয়নের হিট শিল্ড বা তাপবর্ম এই প্রচণ্ড উত্তাপ থেকে মহাকাশচারীদের রক্ষা করবে। শেষে তিনটি বিশাল প্যারাশুট খুলে যাবে এবং ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে ল্যান্ড করবে মহাকাশযানটি।

আর্টেমিস ২ মিশনের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নাসা তাদের পরবর্তী মিশন ‘আর্টেমিস ৩’ পরিচালনা করবে, যেখানে মানুষ সরাসরি চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। এটি মূলত মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতির একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৪ জন মানুষ চাঁদের দেশে গিয়েছেন, আর্টেমিস ২-এর সফলতার মাধ্যমে এই সংখ্যাটি আরও বাড়বে।

পুরো পৃথিবী এখন অধীর অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে ১ এপ্রিলের দিকে, যখন মহাকাশ বিজ্ঞানে রচিত হতে যাচ্ছে নতুন এক মহাকাব্য।

DR/SN
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত