কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রথমবার তৈরি হলো ভাইরাস!

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এমন একটি নতুন ভাইরাস তৈরি করেছেন, যা পরীক্ষাগারে সফলভাবে রেপ্লিকেট (প্রতিলিপি) তৈরি করতে সক্ষম। এই প্রথমবারের মতো এআইয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাইরাসের জিনোম নকশা করে কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

গবেষকদের তৈরি ১৬টি নতুন ভাইরাস কেবল ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এবং মানুষের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না। বিজ্ঞানীরা এই সাফল্যকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরি করার সক্ষমতা জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা (বায়োসেফটি) ও জৈব নিরাপত্তা (বায়োসিকিউরিটি) নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই ব্যবহার করে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ডিজাইন করা সম্ভব হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ নতুন ও কার্যকর একটি ভাইরাস শূন্য থেকে তৈরি করা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বিবিসিকে বলেন, "এটি জেনারেটিভ এআইয়ের সক্ষমতার এক নতুন ধাপ। প্রথমবারের মতো জেনারেটিভ এআই দিয়ে একটি সম্পূর্ণ জিনোম তৈরি করা হয়েছে, যা কোষের ভেতরে প্রতিলিপি তৈরি করতে এবং বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করতে পারে। আমাদের জন্য এটি ছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।"

এই প্রযুক্তি মূলত চ্যাটজিপিটির মতো বৃহৎ ভাষা মডেলের নীতিতে কাজ করে। যেমন ভাষা মডেল শব্দের ধারাবাহিকতা অনুমান করে, তেমনি এখানে Evo1 ও Evo2 নামের এআই মডেল জীবনের ভাষা—অর্থাৎ জিনগত সংকেতের ধারাবাহিকতা—বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেয়।

এআই মডেলগুলোকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ এবং মানুষের জিনগত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে সেগুলোকে এমনভাবে পরিমার্জন করা হয়, যাতে তারা ব্যাকটেরিওফাজ  নামে পরিচিত এমন এক ধরনের ভাইরাস ডিজাইন করতে পারে, যা শুধু নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এআইয়ের তৈরি ৩০২টি সম্ভাব্য নকশা থেকে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জকগুলো পরীক্ষাগারে সংশ্লেষণ (সিনথেসাইজ) করেন। এর মধ্যে ১৬টি সফলভাবে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

গবেষণাগারের পিএইচডি শিক্ষার্থী স্যামুয়েল কিং জানান, গভীর রাতে তারা প্রথম বুঝতে পারেন যে নতুন তৈরি ভাইরাসগুলো কার্যকর হয়েছে।

ব্যাকটেরিয়ার স্তরযুক্ত পেট্রি ডিশে ভাইরাসগুলো প্রয়োগ করার পর বিজ্ঞানীরা অপেক্ষা করছিলেন। কিছু সময় পর ব্যাকটেরিয়ার স্তরে স্বচ্ছ দাগ দেখা দিতে শুরু করে, যা ভাইরাসগুলোর সফল সংক্রমণের প্রমাণ।

স্যামুয়েল কিং বলেন, "স্বচ্ছ দাগগুলো দেখা মাত্রই আমরা ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ি।" আর ব্রায়ান হাই জানান, পুরো গবেষণা দলের সঙ্গে ফলাফল ভাগ করে নেওয়ার পর "ল্যাবরেটরিজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত করতালিতে সবাই আনন্দ প্রকাশ করেন।"

নতুন ধরনের ব্যাকটেরিওফাজ তৈরি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর চিকিৎসা উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই গবেষণা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—এআই এখন প্রকৃতিতে বিদ্যমান জীবের বাইরে সম্পূর্ণ নতুন জৈবিক নকশা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে, যাকে বলা হয় সিনথেটিক বায়োলজি।

ব্রায়ান হাইয়ের মতে, এই প্রযুক্তি নতুন ওষুধ, জিনভিত্তিক চিকিৎসা এবং আধুনিক থেরাপি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানবস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে পারে।

অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—একই প্রযুক্তি অপব্যবহার করে নতুন ও বিপজ্জনক রোগজীবাণু তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণার সঙ্গে প্রকাশিত এক মন্তব্যে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির গবেষক ড. থমাস ইংলেসবি এবং ড. মরিটজ হ্যাঙ্কে লিখেছেন, এই অগ্রগতি "জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা ও জৈব নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি প্রশ্ন" সামনে নিয়ে এসেছে।

তাদের মতে, এখন আর প্রশ্ন এটি সম্ভব কি না; বরং প্রশ্ন হলো—এই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে যাতে মানবসমাজের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ না হয়।

তারা স্পষ্টভাবে মত দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে—এমন নতুন ভাইরাস তৈরির গবেষণা কোনোভাবেই এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে গবেষকরাও বেশ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তারা প্রশিক্ষণ ডেটাবেস থেকে মানুষ বা অন্যান্য জটিল প্রাণীকে সংক্রমিত করতে সক্ষম ভাইরাস বাদ দেন। পাশাপাশি পুরো গবেষণাই পরিচালিত হয় কেবল ব্যাকটেরিওফাজ নিয়ে এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাসম্পন্ন পরীক্ষাগারে।

ব্রায়ান হাইয়ের মতে, বর্তমানে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে যথেষ্ট সহায়ক।

কম্পিউটারের বিট থেকে জীবনের জগতে

ভাইরাসকে জীবন্ত প্রাণী হিসেবে ধরা হয় না। তাই এআই দিয়ে সম্পূর্ণ জীবন্ত প্রাণী তৈরি করতে এখনও আরও বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি প্রয়োজন।

গবেষণায় ব্যবহৃত ব্যাকটেরিওফাজের জিনোম প্রায় ৫ হাজার ৪০০ বেস জোড়া (Base Pair) নিয়ে গঠিত। অথচ সবচেয়ে ছোট জীবন্ত কোষের জিনোমেই প্রায় ৫ লাখ বেস জোড়া থাকে। মানুষের জিনোমে রয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি বেস জোড়া।

ব্রায়ান হাই বলেন, সহজ ধরনের কোনো জীব তৈরি করার চেষ্টা "অনেক কঠিন হবে, তবে অসম্ভব নয়।" ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণায় এগিয়ে যাওয়ারও আগ্রহ রয়েছে তাদের।

স্পেনের পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনথেটিক বায়োলজি গবেষণাগারের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল এই গবেষণাকে "অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, "মানব ইতিহাসে এই প্রথম আমরা কম্পিউটারে বসে জীববৈজ্ঞানিক নকশা তৈরি করতে শুরু করেছি।"

তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যাকটেরিওফাজ দিয়ে সংক্রমণের চিকিৎসা, জিনগত রোগ নিরাময়ে এনজাইম তৈরি এবং ইমিউনোথেরাপিতে ব্যবহারের জন্য নতুন অ্যান্টিবডি উদ্ভাবনের মতো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির সিনথেটিক জিনোমিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক প্যাট্রিক কাই এই গবেষণাকে "একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক" বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তার মতে, "এই সাফল্যের গুরুত্ব শুধু ব্যাকটেরিওফাজেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রমাণ করছে, জিনোমভিত্তিক ভাষা মডেলগুলো বিবর্তনের নকশাগত নীতিগুলো বুঝতে শুরু করেছে। ফলে ভবিষ্যতে এআইয়ের সহায়তায় সম্পূর্ণ জিনোম লেখা বা নকশা তৈরির নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।"

সূত্র: বিবিসি

Maz
আরও পড়ুন