মানুষের মস্তিষ্ক আসলে দুটি পৃথক অঙ্গ!

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম

মানুষের মস্তিষ্ক একটি একক অঙ্গ নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা দুটি পৃথক অঙ্গ নিয়ে এটি গঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, মানব বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে মস্তিষ্কের এই দুটি অংশ আলাদা অবস্থানে ছিল। পরে সেগুলো একত্রিত হয়ে বর্তমান মস্তিষ্কের কাঠামো তৈরি করে।

গবেষকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক মূলত দুটি প্রাচীন স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি, যেগুলো কোটি কোটি বছর ধরে স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং পরে একই কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে দুটি পৃথক স্নায়ুতন্ত্রকে একসঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সাজিয়ে রাখার মতো বলে বর্ণনা করেছেন।

মস্তিষ্কের একটি প্রাচীন অংশ হলো পশ্চাৎমস্তিষ্ক বা মস্তিষ্ককাণ্ড। এটি মাথার খুলির পেছনের দিকে অবস্থিত এবং হৃদ্‌যন্ত্রের স্পন্দন, ঘুমের সূচনা ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মতো জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য কাজগুলো পরিচালনা করে। অন্যদিকে মধ্যমস্তিষ্ক ও অগ্রমস্তিষ্ক ভাষা, যুক্তি এবং বিমূর্ত চিন্তার মতো উচ্চতর মানসিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, মস্তিষ্কের সামনের ও পেছনের এই অংশ দুটি আলাদাভাবে বিকশিত হলেও তারা অত্যন্ত সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। গবেষণার প্রধান লেখক রায়ান জোখাই বলেন, সামনের ও পেছনের মস্তিষ্ক ভিন্ন উৎস থেকে তৈরি হলেও তারা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে একটি কার্যকর মস্তিষ্ক গঠন করেছে, বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, শরীরের পেশির নড়াচড়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সামনের অংশ কোনো নড়াচড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আর পেছনের অংশ সেই নড়াচড়ার সূক্ষ্ম সমন্বয় করে এবং সেটিকে মসৃণভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। একইভাবে মুখ ও ঘাড়ের নড়াচড়ার নির্দেশ সামনের মস্তিষ্ক থেকে শুরু হলেও মোটর নিউরনের মাধ্যমে তা সরাসরি পেছনের মস্তিষ্ক পরিচালনা করে। খাওয়া, গিলতে পারা এবং মুখের অভিব্যক্তি তৈরির জন্য এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশের কোষ গবেষণাগারে তৈরি করা কঠিন কেন, এটি বোঝার চেষ্টা করতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কারে পৌঁছান। মধ্যমস্তিষ্ক ও অগ্রমস্তিষ্কের কোষ তুলনামূলকভাবে সহজে গবেষণাগারে তৈরি করা গেলেও পশ্চাৎমস্তিষ্কের কোষ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে মস্তিষ্ককাণ্ডকে আক্রান্ত করা স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি এবং অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিসের মতো গুরুতর রোগ নিয়ে গবেষণাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।

এর আগে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, ভ্রূণের বিকাশের শুরুতে একটি মাত্র পূর্বসূরি কোষ থেকেই পুরো মস্তিষ্ক তৈরি হয়। কিন্তু ইঁদুরের ভ্রূণের বিকাশের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় পরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকেরা দেখতে পান, পশ্চাৎমস্তিষ্ক সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিকাশগত পথ অনুসরণ করে।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ভ্রূণের এমন একটি পর্যায় পরীক্ষা করেন, যাকে গ্যাস্ট্রুলেশন বলা হয়। এ সময় শরীর প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট আকৃতি নিতে শুরু করে এবং কেবল কোষের একটি থলির মতো থাকে না। মানুষের ভ্রূণে এই পর্যায় নিয়ে একই ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, কারণ গ্যাস্ট্রুলেশন শুরু হওয়ার পর মানব ভ্রূণের ওপর এ ধরনের গবেষণা নৈতিক কারণে অনুমোদিত নয়। তবে গবেষকদের মতে, ইঁদুরে পাওয়া এই ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

গবেষকেরা মস্তিষ্কের দুটি ভিন্ন পূর্বসূরি কোষ শনাক্ত করেন। এর একটি অক্সটি২ নামের একটি জিন প্রকাশ করে এবং পরবর্তী সময়ে অগ্রমস্তিষ্ক ও মধ্যমস্তিষ্কে পরিণত হয়। অন্যটি জিবিএক্স২ নামের একটি জিন প্রকাশ করে এবং পশ্চাৎমস্তিষ্ক তৈরির জন্য নির্ধারিত থাকে। এই দুই ধরনের কোষ কখনো একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়নি।

এরপর গবেষকেরা কোষগুলোর ডিএনএ কীভাবে প্যাকেজ করা রয়েছে তা পরীক্ষা করেন। তারা দেখতে পান, দুটি কোষগোষ্ঠীর ডিএনএ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সাজানো। স্ট্যানফোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকাশের শুরুর এই পার্থক্য কোষগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন পরিণতির দিকে স্থির করে দেয়, যেন দুটি সমান্তরাল পথে চলা যাত্রা, যেগুলো কখনো একে অপরকে অতিক্রম করে না।

স্ট্যানফোর্ডের বিকাশগত জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কাইল লোহ বলেন, মস্তিষ্কের সামনের অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পূর্বসূরি কোষ থেকে তৈরি হয়, এমন তথ্য প্রথমবারের মতো তারা দেখাতে পেরেছেন। তার মতে, পুরো মস্তিষ্ক একটি অঙ্গ হিসেবে তৈরি হলে সম্ভবত তা আরও কার্যকর হতো। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক এখনো দুটি পৃথক অংশে তৈরির সেই প্রাচীন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

গবেষকদের ধারণা, বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে আগে থেকেই বিদ্যমান দুটি স্নায়ুতন্ত্রকে স্থানগতভাবে একসঙ্গে এনে বর্তমান মস্তিষ্কের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই ধারণার পক্ষে আরও প্রমাণ মিলেছে অ্যাকর্ন ওয়ার্ম নামের সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যেও। মানুষের সঙ্গে দূরবর্তী সাধারণ পূর্বপুরুষ থাকা এসব প্রাণীর মধ্যেও একই ধরনের দুটি পৃথক স্নায়ুতন্ত্রের কাঠামো দেখা গেছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, এর অর্থ প্রায় ৫০ কোটি বছর আগেও এ ধরনের পৃথক স্নায়ুতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকতে পারে, যা পরে প্রায় একক ব্যবস্থার মতো কাজ করতে শুরু করে।

এই আবিষ্কারের ফলে এখন বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে মস্তিষ্ককাণ্ডের নিউরন তৈরি করে সেগুলোর কার্যক্রম পরীক্ষা করতে পারবেন। গবেষকেরা ইতিমধ্যে মানব প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষকে ব্যবহার করে কার্যকর পশ্চাৎমস্তিষ্কের মোটর নিউরন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব স্টেম কোষ মানবদেহের বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে।

গবেষকদের আশা, পশ্চাৎমস্তিষ্কের নিউরন তৈরি করতে পারার এই সক্ষমতা স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি ও অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগের চিকিৎসা গবেষণাকে আরও এগিয়ে নেবে। এসব রোগে পশ্চাৎমস্তিষ্কের মোটর নিউরন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়, তবে কীভাবে এই ক্ষয় ঘটে তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

রায়ান জোখাই বলেন, স্টেম কোষ থেকে গবেষণাগারে বিপুলসংখ্যক মানব পশ্চাৎমস্তিষ্কের মোটর নিউরন তৈরি করার সক্ষমতা এসব রোগের নতুন মডেল তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। তারা এখন গবেষণাগারে উচ্চমাত্রার বিশদে স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফির কারণে পশ্চাৎমস্তিষ্কের মোটর নিউরন কীভাবে মারা যায়, তা পরীক্ষা করছেন। একই ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগটির ওষুধ আবিষ্কার ও পরীক্ষা করারও আশা করছেন তারা।

ভবিষ্যতে এই গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পুনর্জননমূলক চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির পথও খুলতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা। গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে নেচার নিউরোসায়েন্স সাময়িকীতে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত