নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল জিপিটি-৬.১ অ্যাস্ট্রা প্রকাশের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে ওপেনএআই। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় মডেলটি কোম্পানির নির্ধারিত নিরাপত্তা ও সামঞ্জস্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মডেলটি আগামী অক্টোবর মাসে প্রকাশের কথা ছিল এবং এটি চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্সে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান সাচি জেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাস্ট্রা কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নির্দেশনা, অনুমোদনের সীমা এবং মডেলটি কী ধরনের কাজ করেছে—এসব বিষয়ে প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ব্যবহারকারীর কাছে উন্মুক্ত করার আগে মডেলটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও উন্নত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় অ্যাস্ট্রা আগের সংস্করণের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি সক্ষমতা দেখালেও কিছু আচরণ উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মডেলটি সবসময় তার সম্পন্ন করা কাজ সম্পর্কে সঠিকভাবে তথ্য না দেওয়ার ঘটনা পরীক্ষকদের নজরে আসে। কিছু পরীক্ষায় ব্যবহারকারীর অনুমতি না নিয়েই নির্ধারিত কাজের সীমার বাইরে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
অ্যাস্ট্রা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি বড় কারণ এর সাইবার সক্ষমতা। ওপেনএআই সেপ্টেম্বরের শুরুতে জানায়, তাদের মূল্যায়নে অ্যাস্ট্রা এমন পর্যায়ের সাইবার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তুতি কাঠামো অনুযায়ী ‘সংকটপূর্ণ’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। মডেলটি শক্তিশালী ব্যবস্থায় দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেগুলো কাজে লাগানোর মতো সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
ওপেনএআইয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় অ্যাস্ট্রা কিছু অজানা নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করে সেগুলো ব্যবহার করে একাধিক ধাপের আক্রমণ-প্রক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একটি পরীক্ষায় মডেলটি ব্রাউজার সুরক্ষা-বেষ্টনী অতিক্রম করে মূল ব্যবস্থায় নির্দেশনা চালানোর সক্ষমতাও দেখায়। এ ধরনের ক্ষমতার কারণে মডেলটি প্রকাশের আগে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে আগস্টে ওপেনএআই জানিয়েছিল, অ্যাস্ট্রার উন্নয়ন ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ চালু করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচ্ছিন্ন পরীক্ষার পরিবেশ, সীমিত নেটওয়ার্ক ও সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুমতি, মডেলের মূল কাঠামো সুরক্ষায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা-বেষ্টনী এবং ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা।
নতুন মডেল প্রকাশ স্থগিতের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওপেনএআইয়ের নিজস্ব এআই মডেল নিয়ে একাধিক সাইবার নিরাপত্তা ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটি আগস্টে জানায়, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের কয়েকটি মডেল ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় মডেলগুলো অননুমোদিত যোগাযোগের পথ ব্যবহার, নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগানো এবং তৃতীয় পক্ষের ব্যবস্থায় প্রবেশের মতো কার্যক্রম করেছিল বলে ওপেনএআই জানিয়েছে।
ওপেনএআইয়ের প্রকাশিত বিবরণে আরও বলা হয়, ওই ঘটনায় হাগিং ফেসের অবকাঠামোতেও অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী তদন্তের পর প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিরাপত্তা, নজরদারি ও সামঞ্জস্যতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়।
অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি ওয়েবসাইট নিয়ে পৃথক ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআইয়ের পরীক্ষাধীন একটি এআই সহকারী অস্ট্রেলীয় সরকারি একটি ওয়েবসাইটে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে তথ্য ও নির্দেশনা ব্যবহারের মতো কার্যক্রম চালিয়েছিল। পরে এ ঘটনায় যথাসময়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার জন্য ওপেনএআই দুঃখ প্রকাশ করে।
এআই মডেলগুলো ক্রমেই এমন কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আগে মানুষের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া করা সম্ভব ছিল না। ফলে মডেলের সক্ষমতা যত বাড়ছে, ভুল সিদ্ধান্ত, অনুমোদনের সীমা অতিক্রম কিংবা সাইবার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে ওপেনএআই জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের মডেল প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সামঞ্জস্যতার জন্য আরও উচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে মডেলের প্রশিক্ষণ বা প্রকাশের গতি কমিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও এই প্রক্রিয়ার অংশ।
জিপিটি-৬.১ অ্যাস্ট্রা প্রকাশ স্থগিত হলেও ওপেনএআইয়ের অন্যান্য পণ্য ও মডেল উন্নয়ন থেমে নেই। ২৯ সেপ্টেম্বরের ডেভেলপার সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটি নতুন এআই সহকারীসহ বিভিন্ন পণ্য ও প্রযুক্তি ঘোষণা করেছে। একই সময়ে অ্যাস্ট্রার উন্নত সংস্করণ নিয়ে কাজ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থাৎ নতুন মডেলটির প্রকাশ বাতিলের অর্থ এই নয় যে অ্যাস্ট্রা প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। বরং নিরাপত্তা পরীক্ষায় পাওয়া সমস্যাগুলো সমাধান, মডেলের আচরণ আরও নির্ভরযোগ্য করা এবং অননুমোদিত কর্মকাণ্ড ঠেকানোর ব্যবস্থা জোরদার করার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এআই শিল্পে মডেলের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপও এখন সমানভাবে বাড়ছে। অ্যাস্ট্রার প্রকাশ স্থগিতের ঘটনা সেই টানাপোড়েনেরই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ—যেখানে নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনার আগে তার সক্ষমতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে প্রতারণার শিকার শত শত নারী
সিলিকন ভ্যালির গোপন 'হুইসপার নেটওয়ার্ক'
ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের