কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে প্রযুক্তিটির ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ৩২টি দেশের ৩০০-এর বেশি বিজ্ঞানী। তাঁদের সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া অধিক স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সাইবার হামলার মুখে ফেলতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। বিশেষ করে যেসব এআই ব্যবস্থা সাইবার হামলা পরিচালনায় সক্ষম হতে পারে, সেগুলোর পরীক্ষার জন্য ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ‘এয়ার-গ্যাপড’ পরিবেশ ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, এআই মডেল নিরাপদ পরীক্ষার পরিবেশের বাইরে চলে যাওয়ার সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সাধারণ সাইবার নিরাপত্তাবিধি মেনেই ঠেকানো সম্ভব হতে পারত। এতে ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এআই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
নিজে থেকেই ছড়িয়ে পড়তে পারে ম্যালওয়্যার
এআইনির্ভর সাইবার হামলার আশঙ্কা আরও বেড়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায়। সোমবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের এআই মডেলগুলো অদূর ভবিষ্যতে এমন ম্যালওয়্যার তৈরিতে সক্ষম হতে পারে, যা নিজে থেকেই ছড়িয়ে পড়বে এবং স্মার্ট টেলিভিশন, নিরাপত্তা ক্যামেরা ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির মতো ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইসকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই ব্যবস্থা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই অপরিচিত ডিভাইস শনাক্ত করতে পারে। এমনকি চলতি বছরের শেষ নাগাদ তুলনামূলক ছোট এআই মডেলও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার হামলা পরিচালনা করতে সক্ষম হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ধরনের ম্যালওয়্যার শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। কারণ, সংক্রমণ তাৎক্ষণিকভাবে না ছড়িয়ে কয়েক দিন ধরে ধীরে ধীরে একাধিক যন্ত্রে বিস্তার লাভ করতে পারে। ফলে আক্রান্ত ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ার আগে হামলার উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকিতে
ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রে সাইবার হামলার ক্ষতিকর প্রভাব ইতিমধ্যে প্রচলিত হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে। আল জাজিরার সোমবারের এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে হ্যাকাররা শত শত সুপারমার্কেটের শীতলীকরণব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এতে ২ লাখ ২০ হাজার ডলারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনা দেখায়, ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল দৈনন্দিন সেবায় সাইবার হামলা কীভাবে বাস্তব অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করতে পারে। এআইয়ের মাধ্যমে হামলা আরও স্বয়ংক্রিয় ও বিস্তৃত হলে ঝুঁকির মাত্রা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, অ্যাক্সিওসের শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআইসহ শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা সম্ভাব্য ভয়াবহ এআই-সম্পর্কিত নিরাপত্তা ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা করছেন। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে বড় আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট এবং পানি ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কয়েকজন প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এটি তাঁদের আশঙ্কা; নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
এআই এজেন্টের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, উন্নত এআই এজেন্ট কখনো কখনো প্রত্যাশার বাইরে আচরণ করতে পারে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড লি ওপেনএআইয়ের তৈরি এআই এজেন্টের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
লি বলেন, ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টগুলো পরীক্ষার পরিবেশে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে হাগিং ফেসের সার্ভারে অনুপ্রবেশ করেছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তাঁকে তিনটি বিষয়ে উদ্বিগ্ন করেছে: এআই এজেন্টের সক্ষমতা সম্পর্কে নির্মাতাদের যথাযথ ধারণা না থাকা, এজেন্টগুলোর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে হামলায় সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানুষের কাছে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়া বা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।
এ ধরনের দাবি উন্নত এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা পরীক্ষা, তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে ঘটনাটির বিস্তারিত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠনের সুপারিশ
বিজ্ঞানীরা এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এআই ব্যবস্থাকে মানুষের লক্ষ্য ও নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার সর্বোত্তম পদ্ধতি নির্ধারণে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করা। পাশাপাশি এআই-সম্পর্কিত নিরাপত্তা ঘটনার তথ্য দ্রুত প্রকাশের বাধ্যবাধকতা চালুরও সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে এআই উন্নয়ন, পরীক্ষা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উন্নত এআই একদিকে উৎপাদনশীলতা ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে এর স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাইবার সক্ষমতা নতুন নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করছে। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তার মূল কথা হলো এআইয়ের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি।
সূত্র: তাসনিম নিউজ, আল জাজিরা ও অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে।
'ভারতের তরুণদের অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা'
ভারতের কাছ থেকে নেওয়া শিক্ষা কি স্বীকার করবেন ট্রাম্প?
আট বিভাগে দ্রুত ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অসুস্থতার কারণে ক্যাম্পাস ছেড়েছি: চুয়েটের ভিসি