মানব জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সোনার গল্প। প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল বিশ্ব পর্যন্ত সোনার গুরুত্ব ও ব্যবহারে এসেছে নানা পরিবর্তন। চলুন জেনে নেওয়া যাক সময়ের আবর্তনে সোনার উল্লেখযোগ্য কিছু মাইলফলক।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরেই প্রথম সোনা গলিয়ে ব্যবহার করা শুরু হয়। এর প্রায় এক হাজার বছর পর, মিশরীয়রা সোনাকে ‘মাটির চেয়েও বেশি প্রাচুর্যপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করেন। বিখ্যাত ফারাও তুতানখামুনের সোনার মুখোশ তৈরি হয় খ্রিস্টপূর্ব ১২২৩ সালে।
খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে ইতিহাসের প্রথম সোনার মুদ্রা তৈরি হয় তুরস্কের লিডিয়া অঞ্চলে। এগুলো ছিল সোনা ও রূপার মিশ্রণ। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬০ নাগাদ লিডিয়ার রাজা ক্রয়েসাসের নামে ‘ক্রোসিড’ নামের বিশুদ্ধ সোনা-রূপার মুদ্রা চালু হয়, যা বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক লেনদেনে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
১৪৮৯ সালে ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি সপ্তাহের শাসনামলে প্রথম ‘গোল্ড সোভেরিন’ মুদ্রা চালু হয়। ১৭১৭ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ চালু করে, যেখানে মুদ্রার মান সরাসরি সোনার মজুদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৮৪৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনার খনি পাওয়ায় শুরু হয় ‘গোল্ড রাশ’, যাতে লাখো মানুষ সোনার সন্ধানে আমেরিকায় পাড়ি জমায়।

বিংশ শতাব্দীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব মুদ্রাব্যবস্থায় মার্কিন ডলার প্রাধান্য পায়, যা সোনার দামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এই ব্যবস্থা বাতিল করলে সোনার সঙ্গে সরাসরি মুদ্রার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

গত কয়েক দশকে সোনার বিনিয়োগে এসেছে ডিজিটাল বিপ্লব। ২০১৫ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল মিন্ট ‘ডিজিটাল গোল্ড’ পরিষেবা চালু করে, যেখানে মাত্র ২০ পাউন্ড দিয়ে সোনার বারয়ের অংশ কিনে ডিজিটালি সংরক্ষণ করা যায়। ২০২০ সালে তারা প্রথম সোনা-ব্যাকড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালু করে, যা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়।
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মজুদের একটি বড় অংশ সোনায় রেখে দেয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি ও যুদ্ধবিগ্রহের সময় সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সোনার ডিজিটাল লেনদেন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ছে, যা এই প্রাচীন ধাতুকে একবিংশ শতাব্দীর বিনিয়োগ বাজারে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

সোনার এই যাত্রাপথ দেখিয়ে দেয়, কীভাবে একটি ধাতু কেবল অলংকার বা মুদ্রাই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
দেশের বাজারে আজ নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা
স্বর্ণ উৎপত্তির নতুন তত্ত্ব , কী বলছে বিজ্ঞান
