রাজধানীর বাতাসকে দূষণমুক্ত রাখতে শহরের আশপাশের ইটভাটা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও খোদ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যেই গড়ে উঠেছে রি-রোলিং মিল। এসব কারখানার কালো ধোঁয়া ভয়াবহ ধারণ করেছে। এ ধোঁয়ায় দিনের বেলায়ও আশপাশের এলাকাজুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। পরিবেশদূষণ থেকে রক্ষা পেতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও মিলের কালো ধোঁয়া গিলে খাচ্ছে রাজধানীর নির্মল বাতাসকে। অনেক কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না চরম এই পরিবেশদূষণ। বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীবাসী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পরিবেশ থাকলে মানুষের শরীরে ক্যান্সার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ফুসফুস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস রোগের প্রচণ্ড ঝুঁকিও রয়েছে।
এই দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এটিপি স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, অধিকাংশ কারখানা এসব মানছে না। কিছু কিছু কারখানায় এটিপি স্থাপন করা হয়েছে, তবে সেগুলো কার্যত ব্যবহার হয় না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর শ্যামপুর, পোস্তগোলা ও কদমতলী, ঢাকাম্যাচ, আলীবহর এলাকায় অসংখ্য স্টিল ও রি-রোলিং মিল কারখানা রয়েছে। এসব কলকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত কালো বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। সেখানে অসংখ্য আবাসিক ভবন, স্কুল, শ্যামপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শ্যামপুর মডেল মাদ্রাসা, শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঐতিহ্যবাহী শ্যামপুর লাল মসজিদসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এ ছাড়াও সিটি কপোরেশনের ৬৪ নম্বর ওয়ার্ডে শাহারিয়ার স্টিল মিল ও জহির স্টিল মিলের কালো ধোঁয়ায় ওই এলাকা অধিকাংশ সময় অন্ধকার হয়ে থাকে। ধোঁয়া থেকে বাঁচতে পথচারীদের নাক চেপে চলাচল করতে দেখা গেছে। এভাবে দিনের পর দিন পরিবেশের ক্ষতি করে উৎপাদন হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রড।
শাহারিয়ার স্টিল মিলের পাশেই গড়ে উঠেছে কয়েটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ড. মাহাবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অ্যান্ড হাইস্কুল, ধার্মিকপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোলাম মোস্তফা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অন্যতম। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিশুদের অজানতেই নিশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যাচ্ছে বিষ। যা থেকে মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ড. মাহাবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের প্রিন্সিপাল ওবায়দুল্লাহ নয়ন দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি কিভাবে পায়, তা আমার জানা নেই। এসব কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের শরীরে নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, পরিবেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করা এসব কারখানা বন্ধ কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া উচিত। একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যেমেও পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে কথা বলতে কারখানার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, পরিবেশকে আমরা নিজেরাই ধ্বংস করছি। আমরা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোকে বলছি কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য, অথচ কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে নিজেরা নির্গমন বাড়িয়ে চলেছি। একদিকে রাজধানীর আশপাশের ইটভাটা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। অন্যদিকে রাজধানীর মধ্যেই কারখানার অনুমতি দিয়ে রেখেছি । আমাদের এই দ্বিমুখী অবস্থান নৈতিক নয়। আমরা যেহেতু জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছি। আমাদের নিজেদের নির্গমন কমানোর জন্য আগে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা উন্নত দেশগুলোকে নিয়মনীতির কথা বলছি, কিন্তু নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেটে) মো. আব্দুস সালাম সরকার দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, চলতি বছর আমরা নতুন হারে এনফোর্সমেন্ট ধার্যের বিষয়টি কার্যকর করেছি। ফলে পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে এখন আগের চেয়ে বেশি অভিযান পরিচালনা ও ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হচ্ছে। পরিবেশদূষণের দায়ে অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিব।