২০১৬ সালের ১৯ আগস্ট। রিও অলিম্পিকের নারী হকির ফাইনাল। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে ৩-৩ সমতায়। এবার সোনার লড়াই গড়িয়েছে পেনাল্টি শুটআউটে। মাঠে যেমন টানটান উত্তেজনা, ব্রিটেনের ঘরেও তখন থমথমে পরিবেশ।
সেদিন প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বিবিসিতে চোখ রেখেছিলেন সেই ম্যাচে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের বালমোরাল প্রাসাদেও চলছিল একই উত্তেজনা। এমনকি ম্যাচের চাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও।
রানির পুত্রবধূ সোফি, ডাচেস অব এডিনবরার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তিনি তখন রাতের খাবারের টেবিলে বসেছিলেন। টেবিলের কাজে থাকা একজন ফিসফিস করে তাঁকে ম্যাচের স্কোর জানাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে রানি নিজেই বলেন, আরে, যাও তো! এরপর দৌড়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে খেলা দেখতে শুরু করেন সোফি।
পেনাল্টি শুটআউট যত এগোতে থাকে, উত্তেজনাও তত বাড়ে। সোফি জানান, তিনি লাফিয়ে উঠছিলেন, চিৎকার করছিলেন। ঠিক তখনই পাশের ড্রয়িংরুমের দরজায় এসে দাঁড়ান রানি। কিন্তু সেই চাপ বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেননি তিনি। পেনাল্টির উত্তেজনা থেকে নিজেকে সরিয়ে আবার চলে যান।
অন্যদিকে রিওতে ইতিহাস লিখতে তখন প্রস্তুত ব্রিটিশ নারী হকি দল।
হেলেন রিচার্ডসন-ওয়ালশ ও হলি পিয়ার্ন-ওয়েবের পেনাল্টি গোলে শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে স্বর্ণপদক নিশ্চিত করে গ্রেট ব্রিটেন। নারী হকিতে এটিই ছিল ব্রিটিশ দলের প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণ। ১৯৮৮ সালের পর পুরুষ-নারী মিলিয়ে হকিতে ব্রিটেনেরও প্রথম অলিম্পিক সোনা।
তবে কাগজে-কলমে এই ম্যাচে ফেভারিট ছিল নেদারল্যান্ডস। ২০০৮ ও ২০১২ অলিম্পিকে টানা স্বর্ণজয়ী ডাচ দলটি তখন বিশ্বের এক নম্বর দল এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। রিওতে টানা তৃতীয় অলিম্পিক শিরোপার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তারা।
অন্যদিকে ব্রিটেনও অবশ্য কম আত্মবিশ্বাসী ছিল না। রিওতে তারা আটটি ম্যাচের আটটিই জিতেছিল এবং ২১ গোল করে ছিল টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা দল।
দলের ভেতর তখন নানা কুসংস্কারও জায়গা করে নিয়েছিল। সবাই বাসে একই আসনে বসতেন। কোচ ড্যানি কেরি প্রতিটি ম্যাচে একই ধোয়া অন্তর্বাস পরতেন। সোফি ব্রের অলিম্পিকজুড়ে নিজের কিটও পরিষ্কার করেননি।
ফাইনালের আগে টানেলের একটি দৃশ্যই হেলেন রিচার্ডসন-ওয়ালশকে বিশ্বাস করিয়ে দিয়েছিল, এবার তাদের সময়।
ডাচ খেলোয়াড়েরা সেদিন অস্বাভাবিকভাবে উচ্ছ্বসিত ছিলেন, চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। বিপরীতে ব্রিটিশ খেলোয়াড়েরা ছিলেন স্থির, চোখে দৃঢ়তা। সেই মুহূর্তে হেলেনের মনে হয়েছিল, এবার জয়ের পালা তাদেরই।
সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয়েছিল।
দশ বছর পরও সেই দলের সদস্যরা প্রতি ১৯ আগস্ট একে অপরকে বার্তা পাঠান। যেন নিজেদেরই আবার মনে করিয়ে দেন, তারা ইতিহাস গড়েছিলেন।
কেট রিচার্ডসন-ওয়ালশের কাছে সেই রাত এখনো অনেকটা স্বপ্নের মতো। কখনো কখনো নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়, সত্যিই কি এমন কিছু ঘটেছিল?
কিন্তু সেই স্বপ্নের পর ব্রিটিশ নারী হকির পথটা আর ততটা মসৃণ থাকেনি।
টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতলেও ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে পদকহীন থাকে দলটি। ২০০৮ সালের পর সেটিই ছিল প্রথম অলিম্পিক, যেখানে ব্রিটিশ নারী হকি দল কোনো পদক জিততে পারেনি।
২০২১ সালের পর বড় কোনো টুর্নামেন্টে গ্রেট ব্রিটেন বা ইংল্যান্ড নারী দলও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। ব্যতিক্রম ২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণ। প্রো লিগেও গত তিন আসরে তারা নয় দলের মধ্যে সপ্তমের ওপরে উঠতে পারেনি।
এদিকে ২০১৬ সালের সেই সাফল্যকে ঘিরে হকির দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও অংশগ্রহণমূলক ভিত্তি যথেষ্ট শক্ত করা যায়নি বলে মনে করেন সাবেক এক ব্রিটিশ নারী খেলোয়াড়। তাঁর মতে, অলিম্পিক স্বর্ণ হকির জন্য যে বিশাল সুযোগ তৈরি করেছিল, সেটিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রস্তুত ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ইংল্যান্ড হকির প্রধান নির্বাহী রিচ বিয়ার অবশ্য মনে করেন, সাফল্যের পর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে লন্ডনে নারী বিশ্বকাপ আয়োজন এবং জুনিয়র পর্যায়ে ক্লাব অংশগ্রহণ বাড়ার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন। আগামী বছর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও আয়োজন করবে ইংল্যান্ড।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন তৃণমূলে।
স্পোর্ট ইংল্যান্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে নিয়মিত হকি খেলা নারীর সংখ্যা ৮৪ হাজার ২০০-২০১৬ সালের তুলনায় ৭ হাজার বেশি। কিন্তু একই সময়ে নারী ফুটবল, রাগবি ও নেটবলে যে বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, হকির ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি।
বরং অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ে অংশগ্রহণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০১৭-১৮ মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে হকি খেলত প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ শিশু। ২০২৪-২৫ মৌসুমে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লাখ ৮৮ হাজারে।
হকিকে ঘিরে আরেকটি পুরোনো সমস্যা হলো, এটি এখনো অনেকের কাছে বেসরকারি স্কুল ও তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের খেলাধুলা হিসেবে পরিচিত। ইংল্যান্ড হকি কমিউনিটি ক্লাব, রাষ্ট্রীয় স্কুলের কর্মসূচি এবং বিনামূল্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই চিত্র বদলানোর চেষ্টা করছে।
প্রজেক্ট ২০১১-এর মতো উদ্যোগের লক্ষ্যও রাষ্ট্রীয় স্কুলের প্রতিভাবান তরুণদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও সুযোগের আওতায় আনা।
তবু অর্থের সীমাবদ্ধতা বড় বাস্তবতা। ফুটবলের মতো বাণিজ্যিক খেলাগুলোর বিপুল অর্থবল দিয়ে পূর্ণাঙ্গ পেশাদার একাডেমি গড়ে তোলার অবস্থায় এখনো পৌঁছাতে পারেনি হকি।
তাই রিওর সেই সোনা আজও ব্রিটিশ হকির সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হলেও, এক দশক পর প্রশ্নটা শুধু সেই ইতিহাসকে স্মরণ করার নয়। প্রশ্ন হলো, সেই সোনালি রাতের আলোয় ব্রিটিশ হকি কতটা দূর এগোতে পেরেছে। সূত্র: বিবিসি
বার্সায় যোগ দেওয়ার আগেই রদ্রির জার্সি নম্বর চূড়ান্ত
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে শাস্তি পেলেন ওয়ার্নার
আর্জেন্টিনার 'জামাই' হলেন রোনালদো