মাথা স্বচ্ছ, চোখ ঘোরে, ক্যামেরায় ধরা পড়লো রহস্যময় গভীর সমুদ্রের মাছ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

প্রায় ৬০০ মিটার গভীরে বিরল ব্যারেলআই মাছের দেখা পেয়েছেন সামুদ্রিক গবেষকেরা। স্বচ্ছ মাথার ভেতরে নলাকার চোখ ঘোরানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে মাছটির। প্রায় ৪০ বছরের অনুসন্ধানে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ক্যামেরায় এটি ধরা পড়েছে মাত্র ১১ বার।

গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জগতে এমন এক মাছের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যার মাথার ওপরের অংশ স্বচ্ছ। সেই স্বচ্ছ আবরণের ভেতরে থাকা দুটি বড় নলাকার চোখ আবার ঘোরানো যায়। শিকার খুঁজতে চোখ দুটি ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর খাবার ধরার সময় সামনের দিকে ঘুরে যায়। বিস্ময়কর এই মাছটির নাম ব্যারেলআই (Barreleye), বৈজ্ঞানিক নাম Macropinna microstoma।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মন্টেরে বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এমবিএআরআই) গবেষকেরা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে মাছটির দেখা পান। তাদের গবেষণা জাহাজ ‘ডেভিড প্যাকার্ড’ থেকে পরিচালিত অভিযানে দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযান (আরওভি) ‘ডক রিকেটস’ ব্যবহার করে মাছটির ভিডিও ধারণ করা হয়। এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা মাছটির ৪কে রেজল্যুশনের ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

গবেষকেরা ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের প্রায় ৬০০ মিটার গভীরে মাছটির সন্ধান পান। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণী পর্যবেক্ষণ, ভিডিও ধারণ ও নমুনা সংগ্রহ করা।

মাছটি দেখতে পেয়ে গবেষক দলের সদস্যরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। জাহাজের নিয়ন্ত্রণকক্ষে খবর ছড়িয়ে পড়লে বিজ্ঞানী ও নাবিকেরা সবাই ভিডিও পর্দায় বিরল প্রাণীটিকে দেখতে জড়ো হন।

প্রায় ২০ মিনিট ধরে মাছটিকে পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এ সময় বিভিন্ন আলোকব্যবস্থা ব্যবহার করে এর স্বচ্ছ মাথার গঠন ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্টভাবে ধারণের চেষ্টা করা হয়। এমনকি ডুবোযানটির ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) ক্যামেরা ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক স্টেরিও ছবিও ধারণ করা হয়েছে।

এমবিএআরআইয়ের প্রায় ৪০ বছরের সমুদ্র অনুসন্ধানের ইতিহাসে এটি ব্যারেলআই মাছটির ১১তম পর্যবেক্ষণ। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা প্রায় সাত হাজারবার দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযান নিয়ে সমুদ্রের গভীরে অভিযান চালিয়েছেন এবং ৪১ হাজার ঘণ্টার বেশি ভিডিও ধারণ করেছেন। এত বিপুল অনুসন্ধানের পরও মাছটির দেখা মিলেছে মাত্র ১১ বার। এর আগে সর্বশেষ ২০২১ সালে মাছটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তাঁরা।

ব্যারেলআই মাছের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর স্বচ্ছ মাথার আবরণ। মাথার ওপরের এই জেলির মতো স্বচ্ছ স্তরের ভেতরে চোখ দুটি সুরক্ষিত থাকে। চোখগুলো লম্বা নলের মতো এবং সাধারণ অবস্থায় ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সমুদ্রের গভীর অন্ধকার পরিবেশে খাবার খুঁজতে মাছটি পানির ওপরের দিক থেকে আসা ক্ষীণ আলো ও ছায়ার দিকে নজর রাখে। সম্ভাব্য শিকার শনাক্ত করার পর চোখ দুটি ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাক করতে পারে। ফলে শিকার অনুসরণ এবং খাবার ধরার সময় মাছটি দৃষ্টির দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

এর স্বচ্ছ আবরণ শুধু চোখের অবস্থান ধরে রাখে না, শিকার ধরার সময় চোখকে সুরক্ষাও দেয়। গভীর সমুদ্রে সিফোনোফোর নামে পরিচিত দংশনক্ষম সামুদ্রিক প্রাণীর শুঁড়ে আটকে থাকা ছোট ক্রাস্টেশিয়ান বা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী খাওয়ার সময় এই আবরণ বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ব্যারেলআই মাছ সমুদ্রের ‘টুইলাইট জোন’ বা গোধূলি অঞ্চলে বসবাস করে। এই অঞ্চলে সূর্যের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। ফলে সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের খাবার খোঁজা, শিকার শনাক্ত করা এবং শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ ধরনের শারীরিক অভিযোজন গড়ে উঠেছে।

মাছটির বড় পাখনা তাকে পানির মধ্যে স্থির থাকতে ও প্রয়োজনমতো দিক পরিবর্তন করতে সহায়তা করে। এটি অনেক সময় প্রায় স্থির অবস্থায় ভেসে থাকে এবং ওপরের দিকে নজর রেখে শিকারের অপেক্ষা করে।

এমবিএআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্টিভেন হ্যাডক বলেন, সমুদ্রের মাঝামাঝি গভীরতায় বসবাসকারী প্রাণীরা কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে, ম্যাক্রোপিন্না তার বিস্ময়কর উদাহরণ। এসব প্রাণী শিকার শনাক্ত করতে পানির মধ্যে চলমান ছায়ার মতো সূক্ষ্ম আলোকসংকেতের ওপর নির্ভর করে।

গবেষকেরা মাছটির চোখের লেন্সে থাকা রঞ্জক পদার্থ নিয়েও আগ্রহী। তাঁদের ধারণা, এই রঞ্জক পদার্থ গভীর সমুদ্রের আলো শনাক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মাছটি ঠিক কী ধরনের আলোকসংকেত অনুসরণ করে, চোখ ঘোরানোর পেছনে সব পরিস্থিতিতে কী প্রক্রিয়া কাজ করে এবং লেন্সের সবুজাভ রঙের সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা কী—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এবারের ভিডিওতে মাছটির চোখ, স্বচ্ছ মাথার আবরণ এবং চলাচলের ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। গবেষকেরা মাছটি সংগ্রহ করেননি; সমুদ্রের স্বাভাবিক পরিবেশেই পর্যবেক্ষণ করে ভিডিও ধারণ করেছেন।

গবেষকদের আশা, এই উচ্চ রেজল্যুশনের ফুটেজ গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের দৃষ্টিশক্তি, আলো শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে সহায়তা করবে।

বিজ্ঞানীদের কাছে ব্যারেলআই শুধু অদ্ভুত দেখতে একটি মাছ নয়; বরং পৃথিবীর সবচেয়ে কম অনুসন্ধান করা পরিবেশগুলোর একটিতে প্রাণের টিকে থাকার অসাধারণ কৌশলের একটি উদাহরণ।

সূত্র: মন্টেরে বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এমবিএআরআই), ফিজ ডট অর্গ।

এএইচএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত