বাড়ছে স্বর্ণের দাম, নেপথ্যে ৩ কারণ

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩০ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নজিরবিহীন উচ্চতায় উঠেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদের খোঁজ—সব মিলিয়ে স্বর্ণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি হয়েছে। 

গত সোমবার প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে ৫ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। যদিও সাম্প্রতিক দিনে দাম কিছুটা কমেছে, তবুও স্বর্ণ এখনও বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে রুপার দামেও বড় উত্থান দেখা গেছে। বর্তমানে প্রতি আউন্স রুপা লেনদেন হচ্ছে প্রায় ৯৮ ডলারে, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৩৫ ডলার।

স্বর্ণের দাম বাড়ার তিন কারণ-

১. ট্রাম্প-ঘিরে অনিশ্চয়তা

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের এই উল্লম্ফনের অন্যতম বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি। যেসব দেশকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল মনে করছেন না, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

হ্যারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভূমিকা রেখেছে। জানুয়ারিতে স্বর্ণ ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠলেও, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকির কারণে শেয়ারবাজারে পতন দেখা যায়।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র ও রাজস্বনীতির ঝুঁকির তুলনায় স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা, ফলে ধাতুটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

২. যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা

ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং এর ফলে মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমেছে। বিনিয়োগকারীরা তখন নিরাপদ বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকেছেন। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর ডলার তার মেয়াদে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়।

এমা ওয়াল বলেন, ‘বিশ্ব যখন অগোছালো মনে হয়, তখন স্বর্ণ ঠিক তার স্বভাবসুলভ কাজটাই করে—বাণিজ্য উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাম লাফিয়ে বাড়ে।’

৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনা

স্বর্ণের দামের উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনা। এমা ওয়ালের ভাষায়, বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণকে তাদের পছন্দের রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে দেখছে, কারণ এটি তাদের যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর নির্ভরতা থেকে কিছুটা মুক্ত রাখে।

রাশিয়ার ডলার সম্পদ জব্দের উদাহরণ অনেক দেশকে নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদিও ২০২২ সালের তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার গতি কিছুটা কমেছে, তবুও চাহিদা এখনও তুলনামূলক বেশি।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রেতা। সেখানে গহনা কেনার পাশাপাশি বিনিয়োগ হিসেবেও স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারভিত্তিক স্বর্ণ ব্যবসায় যুক্ত কোম্পানিগুলোতে বিপুল অর্থ ঢালছেন। পাশাপাশি নতুন ক্রেতারাও বাজারে বড় আকারে প্রবেশ করেছে। উদাহরণ হিসেবে, ডিজিটাল মুদ্রা প্রতিষ্ঠান টেথার সম্প্রতি এত স্বর্ণ কিনেছে যে তাদের রিজার্ভ নাকি কিছু ছোট দেশের রিজার্ভকেও ছাড়িয়ে গেছে।

দাম কমছে এক কারণে

সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমার পেছনেও স্পষ্ট কারণ রয়েছে। বাজারে আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প এমন একজন ফেড চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারেন যিনি সুদের হার কমানোর দাবিতে নতি স্বীকার করবেন। এতে ডলার দুর্বল হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে—যা সাধারণত স্বর্ণের দামের পক্ষে যায়।

কিন্তু যখন খবর আসে যে ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে ‘কঠোর’ হিসেবে পরিচিত কেভিন ওয়ার্শকে ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন, তখন স্বর্ণের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ কিছুটা কমে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার এক পর্যায়ে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলারের নিচেও নেমে আসে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, দাম কমলেও স্বর্ণ এখনো এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। চলমান যুদ্ধ, শুল্কনীতি ও নতুন শুল্কের হুমকি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা স্বর্ণ ও রুপাকে এখনও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবেই ধরে রেখেছে।

শুক্রবারের দামের অস্থিরতা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—স্বর্ণ যেমন দ্রুত বাড়তে পারে, তেমনি সব পণ্যের মতোই এর দাম দ্রুত কমেও যেতে পারে। সূত্র: বিবিসি

HN
আরও পড়ুন