আষাঢ়, শ্রাবণ আর ভাদ্র এই তিন মাস পেয়ারার মৌসুম। এ মৌসুম এলেই বদলে যায় ঝালকাঠির ভীমরুলী ও আশপাশের জনপদের চিত্র। খালজুড়ে সারি সারি ছোট ডিঙি নৌকা। প্রতিটি নৌকা বোঝাই কাঁচা-পাকা, সবুজ-হলুদ পেয়ারা। নৌকার ওপরই চলে বেচাকেনা। পানির ওপর ভাসমান এই বাজারে প্রতিদিন জমে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্য। পেয়ারা বাগান, খাল আর ভাসমান হাটের অনন্য সমন্বয় দেখতে প্রতিবছর ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা।
এ দৃশ্য ভিয়েতনাম কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির সদর উপজেলার ভীমরুলী গ্রামের। পেয়ারা বাগানের সবুজ আর ফলের ম-ম ঘ্রাণে এখন সেখানে চলছে উৎসবের আমেজ।
সম্প্রতি ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলোহাব সায়দানি। তাঁর মতো প্রতি মৌসুমেই শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন এই ব্যতিক্রমী জলবাজার দেখতে।

ভীমরুলীর খালের ওপর সকাল থেকেই শুরু হয় পেয়ারার বেচাকেনা। বাগান থেকে চাষিরা ছোট নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন মোকামে। খালের দুই পাশে অপেক্ষায় থাকেন আড়তদার ও পাইকাররা। নৌকা থেকেই তারা কিনে নেন পেয়ারা। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জমে ওঠে সবচেয়ে বড় বেচাকেনা।
পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় এই বাজারে বেড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারদের আনাগোনা। ট্রাক, মিনিট্রাক ও পিকআপ নিয়ে তারা আসছেন ভীমরুলীতে। অন্যদিকে নৌপথেও ট্রলার ও নৌকায় করে পেয়ারা চলে যাচ্ছে দেশের নানা অঞ্চলে।
ঝালকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক পেয়ারা অঞ্চল। এসব এলাকার বিভিন্ন গ্রামের হাজার হাজার পরিবার সরাসরি পেয়ারা চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

ভীমরুলীর পাশাপাশি পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির কুড়িয়ানা, আটঘর, আতা এবং ঝালকাঠির মাদ্রাসহ আশপাশের এলাকাতেও বসে পেয়ারার ভাসমান হাট। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব হাটই পিরোজপুরের সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই জলপথকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
পেয়ারা চাষকে ঘিরে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে ২০টিরও বেশি ছোট-বড় মৌসুমি মোকাম। প্রতিদিন সকালে বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে নৌকায় করে আসেন চাষিরা। এরপর সড়ক ও নৌপথে এসব পেয়ারা পৌঁছে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ফেনী, পটুয়াখালী, ভোলা, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
আড়তদারদের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ পেয়ারা কেনাবেচা হয়। পেয়ারা চাষ ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ।
পেয়ারা চাষ ও বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে বড় সংকট। পেয়ারা অত্যন্ত পচনশীল ফল। দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার কিংবা আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পেয়ারা নষ্ট হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা।
জগদীশপুর গ্রামের পেয়ারা চাষি বিমল মিস্ত্রি বলেন, হিমাগারের অভাবে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়ে যায়।
চাষি বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পেয়ারা প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা গেলে এ খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
এ বছর প্রকৃতির বিরূপ আচরণেও চাষিদের মুখে হতাশার ছাপ। ফাল্গুনে গাছে মুকুল আসার সময় অতিরিক্ত খরা ও তীব্র গরমে অনেক মুকুল ঝরে গেছে। কোথাও কোথাও মারা গেছে গাছও। পর্যাপ্ত সার ও মাটি দিতে না পারায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন কমেছে। ১০ বিঘা বাগান থেকে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ মণ পেয়ারা পাওয়ার কথা, সেখানে এবার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৫ মণ।
ভীমরুলীর পেয়ারা চাষি ফণী ভূষণ দাস বলেন, খরা ও তীব্র রোদের কারণে মুকুল ও কচি পেয়ারা পুড়ে গেছে। উৎপাদন কম হওয়ায় দাম ভালো পেলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়।
শুধু কৃষি ও বাণিজ্য নয়, পেয়ারা এখন এই অঞ্চলের পর্যটনেরও অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পেয়ারার মৌসুমে নৌপথে বাগান দেখতে আসেন পর্যটকরা। কেউ নৌকায় ঘুরে দেখেন ভাসমান বাজার, কেউ আবার বাগানে গিয়ে নিজের হাতে গাছ থেকে পেয়ারা ছিঁড়ে খান।
পর্যটকদের আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক পিকনিক স্পট ও ইকো কটেজ। পেয়ারা বাগানের ভেতর নৌকায় ঘোরাঘুরি, ভাসমান বাজার দেখা এবং গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়ার সুযোগ পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে।
ঝিনাইদহ থেকে আসা পর্যটক মশিউর রহমান বলেন, ঝালকাঠির পেয়ারা বাগান ও ভাসমান হাট দেখে তিনি মুগ্ধ। বিশেষ করে পেয়ারা পার্কে নিজের হাতে গাছ থেকে পেয়ারা ছিঁড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল আনন্দের।
কুড়িয়ানা পেয়ারাপার্ক পিকনিক স্পট অ্যান্ড ইকো কটেজের স্বত্বাধিকারী অর্নব মজুমদার বলেন, দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের বাইরের পর্যটকরাও এখানে আসছেন। পেয়ারা ও আমড়ার মৌসুমেই পর্যটকের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান মনে করেন, পেয়ারা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চলতি বছর জেলায় ৫৬২ হেক্টর জমিতে পেয়ারা আবাদ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
সিআইসির প্রথম নারী মহাপরিচালক সেলিনা সুলতানা
৪১ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণা
এয়ারএশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রযুক্তি সহযোগিতা বিষয়ক বৈঠক
৭ ধরনের আয় থাকলে দিতে হবে আয়কর রিটার্ন