দেশের ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে: বিশ্বব্যাংক

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

দেশের দরিদ্র মানুষের বড় একটি অংশ এখনও সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধার বাইরে রয়েছে। সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের প্রায় ৬২ শতাংশই প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। একই সময়ে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন তুলনামূলকভাবে বেশি আয়ের মানুষেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে দেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও ভর্তুকির সুবিধা বণ্টনের এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাজের নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ ধনী মানুষ বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা পান।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার বাইরে রয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ৩১ শতাংশও সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার জিডিপির প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকিতে ব্যয় করছে। এরপরও বিপুলসংখ্যক দরিদ্র পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেনি।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান ও ধ্রুব শর্মা।

ফ্যামিলি কার্ডে বড় সুযোগ দেখছে বিশ্বব্যাংক
দরিদ্র মানুষের কাছে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। তবে কার্ডের সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, প্রচলিত পদ্ধতিতে শুধু ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। কিন্তু প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সুবিধা দেওয়া গেলে বছরে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব।

এ জন্য দারিদ্র্য পরিমাপের স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড ব্যবহার, নগদ সহায়তার প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা, খাদ্যসহায়তার তালিকা পুনর্বিন্যাস এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংযোগ তৈরির সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষকে খাবার কিনতেই তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। একই সঙ্গে কৃষি খাতে ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। তবে সঠিকভাবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে শনাক্ত করে কার্ডের সুবিধা দেওয়া গেলে এই সংখ্যা সাড়ে ২৮ লাখে উন্নীত করা সম্ভব।

বিদ্যুৎ ভর্তুকির বড় অংশ ধনীদের দখলে
সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি ধনী-গরিব সবাই পেলেও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান। সমাজের নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি সুবিধা পান। বিপরীতে ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ মানুষ পান প্রায় ৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সুবিধা যাচ্ছে সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের কাছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ, ভর্তুকি দেওয়ার বর্তমান পদ্ধতিতে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি আয়ের মানুষের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে।

চার বছরে সারে ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ
কৃষি খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারে ভর্তুকি ছিল ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এই সময়ে সারে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় চার গুণ হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই ভর্তুকি দিতে ব্যয় হচ্ছে। এতে কৃষি খাতে গবেষণা, সম্প্রসারণ, মাটি পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ছোট ও ঝুঁকিতে থাকা কৃষকদের কাছে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ড চালুর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি কৃষি খাতে ভর্তুকির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ, মাটি পরীক্ষা, বাজারব্যবস্থা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, টানা চতুর্থ বছরের মতো দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত বছরের তুলনায় নতুন করে আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং নারীদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সময়ে দেশে আয়বৈষম্যও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি খাতে সরকারের ভর্তুকি দরিদ্র মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে। তবে এসব কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো না গেলে সরকারি ব্যয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

বিশ্বব্যাংক মনে করছে, প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে শনাক্ত করে তাদের কাছে নগদ সহায়তা, খাদ্যসহায়তা, ফ্যামিলি কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া গেলে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে। এতে একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত