নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণঝুঁকি ও ঋণের স্থায়িত্ব আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়নে নতুন কাঠামো আনছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থা দুটির নির্বাহী পর্ষদ যৌথ Debt Sustainability Framework for Low-Income Countries (LIC-DSF)-এ সংস্কারের অনুমোদন দিয়েছে।
২০১৭ সালের পর এবারই প্রথম যৌথভাবে এই কাঠামো পর্যালোচনা করা হলো। আইএমএফ বলছে, গত কয়েক বছরে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঋণের পরিমাণ, পরিবর্তিত হয়েছে ঋণের উৎস এবং অভ্যন্তরীণ ও বাণিজ্যিক শর্তে নেওয়া ঋণের গুরুত্বও বেড়েছে।
নতুন কাঠামোর লক্ষ্য পুরো পদ্ধতিকে নতুন করে সাজানো নয়; বরং বিদ্যমান কাঠামোকে পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আরও কার্যকর করে তোলা। এর মাধ্যমে কোন দেশ ঋণঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোন দেশের ঋণ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়—দুই বিষয়কে আরও স্পষ্টভাবে আলাদা করা হবে।
অভ্যন্তরীণ ঋণে বাড়বে নজর
নতুন কাঠামোর অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণকে আরও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, অনেক নিম্ন আয়ের দেশে অভ্যন্তরীণ ঋণ এখন বড় ধরনের ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সরকার ও দেশীয় ব্যাংক খাতের পারস্পরিক নির্ভরতা—যাকে ‘sovereign-bank nexus’ বলা হয়—ঋণঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ কারণে নতুন কাঠামোয় অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণের জন্য আলাদা একটি Domestic Debt Module যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে শুধু বিদেশি ঋণ নয়, দেশের ভেতরে নেওয়া সরকারি ঋণের চাপও আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
জলবায়ু ও উন্নয়ন বিনিয়োগও বিবেচনায়
নতুন কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তাকেও ঋণ বিশ্লেষণের অংশ করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য অবকাঠামো, মানবসম্পদ, জলবায়ু অভিযোজনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ জরুরি। কিন্তু এসব বিনিয়োগের অর্থায়ন করতে গিয়ে যাতে দেশগুলোর ঋণঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ জন্য Long-Term Development Module চালু করা হবে। এর মাধ্যমে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য কতটা আর্থিক সক্ষমতা বা ‘fiscal space’ রয়েছে, তা মূল্যায়নে সহায়তা করবে নতুন কাঠামো।
ঋণঝুঁকি নির্ধারণে আরও সূক্ষ্ম পদ্ধতি
বর্তমান কাঠামোতে কোনো দেশের ঋণঝুঁকি নির্ধারণ করা হলেও নতুন পদ্ধতিতে ঝুঁকির ধরন ও মাত্রাকে আরও বিস্তারিতভাবে আলাদা করা হবে।
আইএমএফ জানিয়েছে, নতুন কাঠামোয় দেশের debt-carrying capacity বা ঋণের বোঝা বহনের সক্ষমতা পরিমাপের পদ্ধতি পরিমার্জন করা হবে। একই সঙ্গে ঋণচাপের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন সীমা পুনর্নির্ধারণ ও সম্প্রসারণ করা হবে।
এর ফলে ঋণসংকটের ঝুঁকিতে থাকা দেশ এবং ইতোমধ্যে টেকসই ঋণ পরিস্থিতির বাইরে চলে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য আরও স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।
বাড়বে ‘স্ট্রেস টেস্ট’
নতুন কাঠামোয় পূর্বাভাস কতটা বাস্তবসম্মত, তা যাচাইয়ে আরও উন্নত stress test ও ‘realism tools’ ব্যবহার করা হবে।
কারণ আইএমএফের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস সাধারণত যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ও রাজস্বের পূর্বাভাসে কিছুটা অতিরিক্ত আশাবাদ দেখা যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণসংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
তাই নতুন কাঠামোয় সরকারি ঋণের তথ্যের পরিধি, মান, স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে। ঋণের তথ্যের ঘাটতি থাকলে সেটিও ঝুঁকি মূল্যায়নে আরও স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
৫ শতাংশই থাকছে ডিসকাউন্ট রেট
ঋণ মূল্যায়নে ব্যবহৃত সমন্বিত discount rate পরিবর্তন করা হচ্ছে না। এটি ৫ শতাংশই থাকছে।
তবে নতুন পদ্ধতিতে ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের অন্যান্য মডেল ও সূচকে পরিবর্তন আনা হবে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে ঝুঁকির মাত্রা আরও সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশভেদে পরিস্থিতির পার্থক্যও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
কিছু মডেল এখনই প্রকাশ করবে না আইএমএফ
নতুন পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঋণ টেকসই নয় এমন পরিস্থিতি শনাক্ত করতে ব্যবহৃত নতুন মডেলের নির্দিষ্ট probability cut-off আপাতত প্রকাশ করা হবে না।
আইএমএফের নির্বাহী পরিচালকরা মনে করছেন, নতুন পদ্ধতিতে কিছু সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করা প্রয়োজন। এরপর মডেলের ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ নতুন কাঠামো আরও তথ্যনির্ভর হলেও এর কিছু অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি-সংকেত ও সীমা আপাতত প্রকাশের বাইরে থাকবে।
কেন এই পরিবর্তন?
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৫ সালে চালু হওয়া LIC-DSF এখনো ঋণঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে কার্যকর। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে।
কোনো দেশ এখন শুধু বৈদেশিক স্বল্পসুদের ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। অভ্যন্তরীণ ঋণ, বাণিজ্যিক ঋণ এবং অন্যান্য নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থার গুরুত্বও বেড়েছে। ফলে শুধু প্রচলিত বৈদেশিক ঋণ সূচক দিয়ে পুরো ঝুঁকি বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে।
নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এই পরিবর্তিত বাস্তবতা ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো ঋণসংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ঝুঁকির সংকেত আগেই শনাক্ত করা, যাতে সরকার ও ঋণদাতারা সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কার্যকর
নতুন কাঠামো এখনই কার্যকর হচ্ছে না। আইএমএফ জানিয়েছে, নতুন LIC-DSF ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কার্যকর হওয়ার কথা।
এর আগে নতুন গাইডলাইন ও Debt Sustainability Analysis (DSA) টেমপ্লেট প্রকাশ করা হবে। দেশভিত্তিক টিম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। পরিবর্তনের সময় বর্তমান কাঠামোও কার্যকর থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধের যেসব শর্ত জানালো ইরান
ভালো ঘুমের জন্য মেনে চলুন এই নিয়মগুলো
রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ আজ
সৌদি বাদশাহকে জামায়াত আমিরের চিঠি, কী বার্তা দিলেন তিনি?