মার্কিন নির্বাচনের পর এআই খাতে শঙ্কা, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ারে বড় ধস

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এআই প্রযুক্তির বিস্তার ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে ধীরগতির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর ব্যাপকভাবে কমেছে। এক দিনের লেনদেনেই এসব প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য থেকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। ডাও জোন্সের তথ্য অনুযায়ী, এতে বাজারমূল্য কমেছে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শেয়ারসূচকেও বড় দরপতন হয়েছে। ২০২৫ সালের পর এটিই ছিল সূচকগুলোর সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর একটি।

এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল সেই শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

শুক্রবার সকালে এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারেও বড় দরপতন দেখা যায়। এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার চিপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম কমে যায়।

জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দুপুরের দিকে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। দেশটির মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারের দাম প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে।

দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম ৮ দশমিক ৮ শতাংশের বেশি কমেছে। স্যামসাংয়ের দর কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরপতনের প্রভাবে সিউলের কসপি সূচক সকালে ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি ঠেকাতে সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ রাখতে হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘সার্কিট ব্রেকার’। পরে দুপুরে সূচকটি প্রায় ৫ শতাংশ কম অবস্থানে ছিল।

এদিকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে ২০০১ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতন হয়েছে। শুক্রবার তাইএক্স সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

মার্কেটওয়াচের চিপ খাতের বিশ্লেষক ব্রিটনি নগুয়েন বলেন, এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয়ের মাত্রা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের ধারাবাহিকতাই এ দরপতনে প্রতিফলিত হয়েছে।

ডেটা সেন্টার নির্মাণে চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ ও এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রস্তাবও ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকবে দলটির হাতে।

টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করে প্রচার চালিয়েছেন। তিনি নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

শেয়ারবাজারের এই দরপতনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের কারণে শেয়ারবাজার ইতিহাসের অন্যতম খারাপ দিন পার করেছে। তাঁর দাবি, এ পরিস্থিতির জন্য রিপাবলিকানরা নয়, ডেমোক্র্যাটরাই দায়ী। তবে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া আরেক পোস্টে ভোটারদেরও দায়ী করেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের কারণেই শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং এর দায় ভোটারদেরই নিতে হবে।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মতে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নজরদারি ছাড়াই এআই খাত অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়েছে। কংগ্রেসে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে এ খাতে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁরা।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরিবেশের ক্ষতি করছেন, কর্মসংস্থান কমিয়ে দিচ্ছেন এবং মানবতার ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছেন। এ কারণে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার দাবি জানান।

এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় পতন

বৃহস্পতিবার ইউরোপের বাজারেও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় দরপতন হয়। চিপ নির্মাতা ইনফিনিয়নের শেয়ারের দাম ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। প্রযুক্তি সরঞ্জাম নির্মাতা এএসএমএলের শেয়ার কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম ৯ শতাংশের বেশি কমে যায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য থেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হারিয়ে যায়। এএমডি ও মাইক্রনের শেয়ারের দাম কমেছে ১৭ শতাংশের বেশি। ইন্টেলের শেয়ার কমেছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। মেমোরি কার্ড নির্মাতা স্যানডিস্কের শেয়ারের দরপতন হয়েছে ২২ শতাংশের বেশি।

সেমিকন্ডাক্টর খাতের ৩০টি বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের গতিবিধি পরিমাপকারী ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচকও ১২ শতাংশের বেশি কমেছে।

ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ এবং টেসলার প্রায় ১১ শতাংশ কমে যায়। এতে প্রতিষ্ঠান দুটির সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন মাস্ক। এর মধ্যে টেক্সাসের সিনেট আসনে কেন প্যাক্সটনের পক্ষে অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্যের অংশ হিসেবে টেক্সাসেও রিপাবলিকানদের পরাজয় ঘটে।

এ ছাড়া অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলাসহ প্রযুক্তি খাতের বহুল আলোচিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত সাতটি প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য এক দিনেই মোট ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমেছে।

প্রযুক্তি খাতের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। আগের দিন অর্জিত সব মুনাফা হারিয়ে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ সূচক ৩ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি পতন নিয়ে লেনদেন শেষ করেছে।

নাসডাকের পতন এতটাই বেশি হয়েছে যে সূচকটি এখন বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায় ‘কারেকশন’ পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত কোনো সূচক বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে অন্তত ১০ শতাংশ কমে গেলে তাকে কারেকশন বলা হয়।

ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের বড় পতনের প্রভাব অন্যান্য বাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে ডেটা সেন্টার নির্মাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও যুক্ত হয়েছে।

ডেটা সেন্টার নিয়ে জনমতকে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন দেখে প্রযুক্তি খাতের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় জনগণের সমর্থন ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এআই অবকাঠামো নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়বে।

ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান বলেন, ডেটা সেন্টার নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া সবাইকে বিস্মিত করেছে। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।

ক্যালিফোর্নিয়ার নাপায় বুধবার রাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রযুক্তিবিষয়ক সম্মেলনে তিনি বলেন, সানফ্রান্সিসকো থেকে টেক্সাস, জর্জিয়া বা অন্য কোথাও অবকাঠামো নির্মাণ করতে গেলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকল্পটি ভালো হবে বলে প্রচার করলেই চলবে না। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে।

মেটার প্রেসিডেন্ট দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিকও বলেন, এআই প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রযুক্তি খাতকে আরও বেশি উদ্যোগ নিতে হবে।

নির্বাচনের ফলাফলের পাশাপাশি এআই খাতের শেয়ার নিয়ে আরেকটি উদ্বেগও বাড়ছে। কিছু বিনিয়োগকারীর আশঙ্কা, এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাস্তব অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গিয়ে বুদ্‌বুদের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে বাজারে বড় ধরনের সংশোধন আসতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত