যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এক সমীক্ষায় এসেছে, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ জীবনে একবার হলেও সুইজারল্যান্ড ভ্রমণের স্বপ্ন দেখে। দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
প্রথম দেখায় সুইজারল্যান্ডকে রূপকথার সেই রাজার রাজ্য বলে বিভ্রম হতেই পারে। বিভ্রান্তি কাটিয়ে যেইমাত্র তাকাবেন, তখনই চোখে ধরা দেবে অপার বিস্ময়। তবে বিস্ময় কাটাবার আর সুযোগ নেই। এরপর যতই সময় গড়াবে ততই বিস্ময়ের অতলে হাবুডুবু খেতে হবে।

সৌন্দর্যের চাদরে মোড়া দেশটির ৭০ ভাগ জুড়েই পাহাড়ি ভূমি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে প্রাকৃতিক হ্রদ। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার হ্রদ রয়েছে সুইজারল্যান্ডে।
মজার বিষয় হলো সুইজারল্যান্ডে মোট ৮৫ লাখ জনসংখ্যা বাস করলেও প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ২ কোটি পর্যটক আসেন যা মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। অপরূপ এই সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে চাইলে আপনিও চলে আসতে পারেন সুইজারল্যান্ডে।
দেশটিতে ভ্রমণের জন্য ঢাকা বারিধারায় সুইজারল্যান্ড দূতাবাসে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস জমা দিয়ে ভিসার আবেদন করতে হবে। কী কী ডকুমেন্ট দিতে হবে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে দূতাবাসের ওয়েবসাইটে।
সুইজারল্যান্ডে দুটো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে যার একটি জুরিখ অপরটি জেনেভা শহরে। তবে ভ্রমণ আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী করতে জুরিখ আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। জুরিখ সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর। জুরিখ বিমানবন্দরে নেমেই আপনাকে ট্রাভেল পাস বা টিকেট কেটে ফেলতে হবে। আপনি যে কদিন থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন সে কয়েকদিনের জন্য টিকিট কেটে ফেললে তা সাশ্রয়ী হবে। কেননা সুইজারল্যান্ডে একই টিকিটে আপনি বাস, ট্রাম, ট্রেন, ক্যাবল কার, জাহাজসহ সব যানবাহনই ব্যবহার করতে পারবেন।

আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরদিন রাখতে পারেন লুজান ও ইন্টারলাকেন। জুরিখ থেকে একদিনের ডে পাসে (টিকেট) ট্রেনে করে ইন্টারলাকেন চলে যেতে পারেন। পথিমধ্যে লুজান নামে ছবির মতো ছোট্ট একটা শহর পড়বে। আপনার হাতে যথেষ্ট সময় থাকলে লুজানে নেমে যাবেন। সেখানে হোয়াইট চ্যাপেল নামে মধ্যযুগীয় ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি না তোলাটা একরকম বোকামি হবে।
লুজান থেকে এক ঘন্টা পর পরই ইন্টারলাকেনে ট্রেন বা বাস যায়। লুজানে মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে চলে যাবেন ইন্টারলাকেন। সুইজারল্যান্ডে অভিনীত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের শ্যুটিং হয় এই ইন্টারলাকেন শহরেই। ভাগ্য ভালো হলে এঞ্জেলিনা জোলি বা বলিউড কিং শাহরুখ খানের সাথেও দেখা হয়ে যেতে পারে আপনার।
ইন্টারলাকেনে জাহাজে উঠতে ভুলবেন না। ছোট ট্যুরিস্ট জাহাজে করে ইজেল্টভাল্ড, থ্যুন, লেক ব্রিঞ্জ ও সুউচ্চ আল্পসের রূপসুধা পান করেই বেলা গড়িয়ে যাবে। বাজেট অনুযায়ী হোটেল দেখে সেদিন থেকে যেতে পারেন ইন্টারলাকেনে।
পরদিন আপনার গন্তব্যে থাকবে সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর দুটো শহর। একটি গ্রিন্ডেলভাল্ড ও অপরটি লাউতারব্রুনেন। এরা সুইজারল্যান্ডের ইয়ংফ্রাউ রাজ্যের অধীনে ভিন্ন দুটো শহর। জার্মান ভাষায় ইয়ও অর্থ স্বল্প বয়স আর ফ্রাউ অর্থ তরুণী। এই রাজ্যটি এতটাই সুন্দর যে একে স্বল্প বয়সী তরুণীর সাথে তুলনা করা হয়েছে।
গ্রিন্ডেলভাল্ডে যাওয়ার পথে ছবির মতো কিছু ছোটো ছোটো গ্রাম মুহুর্তেই আপনাকে মাতাল করে তুলবে।গ্রিন্ডেলভাল্ড থেকে ক্যাবলকারে চড়ে আপনি যেতে পারেন ‘টপ অফ ইউরোপ।’ সেখানে বছরের সবসময় মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। তাই শীতের পোশাক নিতে ভুলবেন না। হাইকিং, স্কিইংসহ নানাবিধ বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে সেখানে।

আর লাউতারব্রুনেনকে বলা হয় জলপ্রপাতের শহর। পথিমধ্যে এতো জলপ্রপাত আর কোথাও দেখতে পাবেন না। লাউতারব্রুনেন থেকে ক্যাবল কারে আপনি চলে যেতে পারেন অনেক উপরের শহর ম্যুরেনে। এটিকে যানবাহন বিহীন শহরও বলা হয়ে থাকে। ম্যুরেনে যাবার একমাত্র উপায় ক্যাবল কার। ম্যুরেন ও লাউতারব্রুনেনের অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ি ঝর্ণা ও আল্পস পর্বতমালা।
সুইজারল্যান্ডের পতাকার রঙের সাথে মিলিয়ে দেশটির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টেলিফোন বুথ গুলো টকটকে লাল রঙে রাঙানো হয়েছে। বেশিরভাগ পর্যটক এখানে ছবি তুলতে পছন্দ করেন। লাউতারব্রুনেনে আপনি পেয়ে যাবেন ঠিক এমনই একটা টেলিফোন বুথ।
বেশিরভাগ পর্যটকের মনে প্রশ্ন জাগে, কোন সময়টায় সুইজারল্যান্ডে ঘুরতে যাবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। স্বাচ্ছন্দ্যের বিচারে অবশ্যই গরমকালেই ঘুরতে যাওয়া ভালো হবে। জুনের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডে চমৎকার আবহাওয়া থাকে। আর শীতে সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য অনুভূতিতে প্রকাশ করা অসম্ভব। যদি আপনার শীত ভালো লাগে এবং আপনি শুভ্র তুষারে মোড়া দেশটি ঘুরতে ও ছবি তুলতে চান তবে শীতকালে যেতেই পারেন। গ্রীষ্মের সবুজে ঢাকা দেশটিই শীতে শুভ্র সাদা চাদরে স্বাগত জানাবে আপনাকে।

