ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনই দাবি করেছেন। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল অভিযানটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত ইউনিট—‘ডেল্টা ফোর্স’।
অভিযানের সময় রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন বাহিনীর আঘাতের ইঙ্গিত দেয়। সিবিএস নিউজ জানায়, পুরো অপারেশনটি ডেল্টা ফোর্সের নেতৃত্বেই সম্পন্ন হয়েছে।
ডেল্টা ফোর্স কী
ডেল্টা ফোর্স প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে এবং এর ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে অভিজাত ও গোপন বিশেষ বাহিনীগুলোর একটি। ইউনিটটি ইউএস আর্মি স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের অধীনে কাজ করে এবং সরাসরি জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের (জেএসওসি) কাছে জবাবদিহি করে। ডেল্টা ফোর্সের আনুষ্ঠানিক নাম হলো ফার্স্ট স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট বা ডেল্টা।
এই বাহিনীর কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে ব্রিটিশ স্পেশাল এয়ার সার্ভিস (২২তম এসএএস রেজিমেন্ট) অনুসরণ করে। ডেল্টা ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল চার্লস বেকউইথ ব্রিটিশ এসএএস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ইউনিটটি গঠন করেন। কাজের গুরুত্ব ও চরম গোপনীয়তার কারণে ডেল্টা ফোর্সকে বিভিন্ন সময় আর্মি কম্পার্টমেন্টেড এলিমেন্টস (এসিই), কমব্যাট অ্যাপ্লিকেশনস গ্রুপ (সিএজি) বা সংক্ষেপে ডেল্টা নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেল্টা ফোর্সের প্রধান মিশন
ডেল্টা ফোর্স মূলত উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও উচ্চমূল্যের বিশেষ অভিযানে নিয়োজিত থাকে। এর প্রধান দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, সন্ত্রাসী হুমকি নির্মূল বা গ্রেপ্তার এবং বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি। এ ছাড়া উচ্চপদস্থ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা দেয়া এবং অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলেও ইউনিটটি প্রশিক্ষিত।
ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা স্নাইপিং, ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং গোপন অনুপ্রবেশ কৌশলে দক্ষ। বিমান, ট্রেন, জাহাজ ও যানবাহনে অভিযান চালানোর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা যে কোনো পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ডেল্টা ফোর্সের কাঠামো
ডেল্টা ফোর্স চারটি প্রধান স্কোয়াড্রনে বিভক্ত। প্রতিটি স্কোয়াড্রনের অধীনে থাকে তিনটি করে ট্রুপ। এর মধ্যে রেক/স্নাইপার ট্রুপ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও স্নাইপার অভিযানের দায়িত্ব পালন করে। বাকি দুটি হলো ডাইরেক্ট অ্যাকশন/অ্যাসল্ট ট্রুপ, যারা সরাসরি আক্রমণ, অভিযান, লক্ষ্যবস্তুতে হানা ও উচ্চঝুঁকির মিশন পরিচালনা করে।
ডেল্টা ফোর্সের উল্লেখযোগ্য অভিযান
ডেল্টা ফোর্সের বেশিরভাগ অভিযানই গোপন রাখা হয় এবং অনেক তথ্য দীর্ঘ সময় পর জনসমক্ষে আসে। সময়ের সঙ্গে যেসব অভিযান সম্পর্কে জানা গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপারেশন প্রাইম চান্স, ২০০১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে খোঁজার অভিযান, বাগদাদ এয়ারস্ট্রাইক, ইরাকে জিম্মি উদ্ধার অভিযান, অপারেশন গথিক সার্পেন্ট (সোমালিয়া), অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি (গ্রেনাডা) এবং আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান।
কারা ডেল্টা ফোর্সে যোগ দিতে পারেন
ডেল্টা ফোর্সে যোগ দিতে পারে কেবলমাত্র সবচেয়ে দক্ষ, শারীরিক ও মানসিকভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সেনাসদস্যরা। সাধারণত এই ইউনিটটি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বেরেটস (স্পেশাল ফোর্সেস) এবং ৭৫তম রেঞ্জার রেজিমেন্ট থেকে সদস্য বাছাই করে। সদস্য বাছাইয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলে তিন থেকে চার সপ্তাহ ধরে।
এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর হওয়ায় খুব অল্পসংখ্যক প্রার্থীই টিকে থাকতে পারেন। শারীরিক পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে ৩৫ পাউন্ড ওজনের রুকস্যাক নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ১৮ মাইল রাতের পদযাত্রা, কিংবা ৪৫ পাউন্ড ওজন বহন করে দুর্গম ও খাড়া পথে ৪০ মাইল দীর্ঘ মার্চ। যারা এসব ধাপ অতিক্রম করেন, তারা ছয় মাসের অপারেটরস ট্রেনিং কোর্স (ওটিসি)-এ অংশ নেন, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মিশনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তোলা হয়। সূত্র: এনডিটিভি
ভেনেজুয়েলা চালাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র