যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা, কৌশলগত চুক্তিতে ইরান-চীন-রাশিয়া

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় অগ্রগতির মধ্য দিয়ে ইরান, চীন ও রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। 

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) হওয়া এই চুক্তিকে একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিষয় ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হচ্ছে।

তেহরান, বেইজিং ও মস্কোর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করে একে নতুন বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এই চুক্তির পেছনে রয়েছে তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ইতিহাস। 

এর আগে ইরান ও রাশিয়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি করে, যার লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করা।

অন্যদিকে, ইরান ও চীন ২০২১ সালেই ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যা বাণিজ্য, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে নতুন এই চুক্তির বিশেষত্ব হলো- এটি প্রথমবারের মতো এই তিন শক্তিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনছে। 

এতে পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সামরিক সমন্বয় ও কূটনৈতিক কৌশলসহ একাধিক বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। তেহরানের কর্মকর্তারা একে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম স্বাধীনতা এবং একতরফা চাপ প্রত্যাখ্যানকারী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি যৌথ অঙ্গীকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত তথ্যে এটি ন্যাটোর মতো কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, বরং এটি পশ্চিমা সামরিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক চাপের বিরোধিতায় গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক জোটের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) ঘিরে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগের বিরুদ্ধে এই তিন দেশের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এতে স্পষ্ট হয়েছে।

এই চুক্তি স্বাক্ষরের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে সামরিক হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি মার্কিন রণতরী বহর মোতায়েন করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে নতুন চুক্তিটি ইরান ও তার অংশীদারদের জন্য এক ধরনের কৌশলগত সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। দীর্ঘদিন পশ্চিমা চাপের মুখে থাকা ইরান এখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্যের সমর্থন দাবি করতে পারছে। এতে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান আরও দৃঢ় হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রচলিত প্রতিরোধ কৌশলকে জটিল করে তুলবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও চীন ইতোমধ্যে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ত্রিপক্ষীয় এই চুক্তি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা ও বাণিজ্যপথ তৈরির গতি আরও বাড়াতে পারে। বিপুল জ্বালানি সম্পদের মালিক ইরান এতে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।

যদিও এটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়, তবুও সামরিক সহযোগিতা ও যৌথ মহড়ার মাধ্যমে পারস্পরিক সক্ষমতা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এবং পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো একটি নতুন কৌশলগত অক্ষের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটার

HN
আরও পড়ুন