হরমুজ প্রণালী কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ?

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০১:২২ এএম

ইরানের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর হামলার যে অভূতপূর্ব নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা নিশ্চিতভাবেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে আরও গভীর ও পোক্ত করেছে।

বস্তুত, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ইরানের সাবেক রাজা বা শাহ রেজা পাহালভীর পতন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠী আসীন হওয়ার পর এই প্রথম ইরানে হামলা চালাল পশ্চিমের কোনো দেশ।

এখন ইরানের জবাব দেওয়ার পালা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে মার্কিন এই হামলার জবাব দিতে পারে ইরান।

হরমুজ প্রণালীর দৈর্ঘ্য ৩৩ কিলোমিটার এবং প্রস্থ স্থানভেদে সর্বোচ্চ ৩৯ কিলোমিটার থেকে সর্বনিম্ন তিন কিলোমিটার। এই প্রণালীর একপাশে ইরান, অপরপাশে ওমান। জলপথটি একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর ও ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করেছে।

বিশ্বের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলোর একটি এই হরমুজ প্রণালী। প্রতিদিন এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দরে পৌঁছায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং তার সমপরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে যত তেল এবং তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহ হয়, তার এক পঞ্চমাংশই যায় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে।

জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোরটেক্সা’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ থেকে ২ কোটি ৮ লাখ পরিশোধিত-অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।

জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিপননকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সদস্যরাষ্ট্র সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাক তাদের বেশিরভাগ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে পাঠায়।

এই পথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ৫ম নৌবহর।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে যে প্রভাব পড়বে

ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তার ব্যাপক প্রভাব পড়বে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে যে পরিমান তেল সরবরাহ হয়, হঠাৎ করে তার এক পঞ্চমাংশ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে লাফিয়ে লাফিয়ে।

তবে ইরান যদি সত্যিই এমন করে, তাহলে তা হবে দেশটির জন্য এক প্রকার আত্মঘাতী পদক্ষেপ। কারণ জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইরানের তেলও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায় এই জলপথ বেয়ে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বর্তমানের ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের পাশে আছে। যদি হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দেয়— তাহলে নিজেদের স্বার্থেই তারা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে— এমন আশঙ্কা রয়েছে ব্যাপক।

এবং শুধু ইরানের নিজের বা উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোই নয়— হরমুজ প্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে বড় ক্ষতি হবে চীনেরও। কারণ, চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ইরানের মোট উৎপাদিত তেলের ৯০ শতাংশই যায় চীনে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি উনিশ কিলোমিটার প্রশস্ত। আর এই প্রণালীর শিপিং লেন তিন কিলোমিটার প্রশস্ত। যেহেতু শীর্ষ পাঁচ তেল রফতানিকারক দেশের অবস্থান আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে, সেহেতু হরমুজ প্রণালী থেকে তেল পরিবহনের পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে। 

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:

• ৩০ মাইল প্রস্থের হরমুজ প্রণালী বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ প্রণালী এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় যে, বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ এখানে রাখতে চায়।

• হরমুজ প্রণালী উপকূলে অবস্থিত ইরানের সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কৌশলগত নৌ বন্দর -‘বন্দর আব্বাস’ এবং ‘বন্দর আব্বাস’ শহর।

• বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পণ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক অঞ্চলের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি।

• ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুমুদ্র যোগাযোগ সম্পূর্ণরুপে নির্ভরশীল এ প্রনালীর ওপর।

• হরমুজ প্রণালী ব্যতীত পারস্য উপসাগরের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। পারস্য উপসাগরের আশেপাশের ৮টি দেশ প্রণালীর উপর প্রতিদিন নির্ভর করে থাকে।

• পারস্য উপসাগরের আশেপাশের দেশগুলোতে অনেক বেশি খনিজ তেল মজুদ রয়েছে। কাজেই তেল বাণিজ্যের বড় একটা অংশ নির্ভর করে হরমুজ প্রণালীর উপরে।

• তেল রপ্তানিকারক ওপেক দেশগুলোর তেল বানিজ্য প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল হরমুজ প্রণালীর ওপর। ফলে কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ।

• হরমুজ প্রণালীর আশেপাশের দেশে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে। এ অঞ্চল থেকে কাতার সবথেকে বেশি এলএনজি গ্যাস রপ্তানি করে থাকে।

• পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশের জীবাশ্ম জ্বালানি হরমুজ প্রণালী হয়ে চীনে প্রবেশ করে। চীন এ অঞ্চল থেকে ৪৫ ভাগ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে থাকে।

• জাপানের ৪৮ ভাগ তেল এবং গ্যাস এর চাহিদা মেটানো হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা পণ্যের মাধ্যমে।

• দক্ষিণ কোরিয়ার তেল এবং গ্যাসের ৩০ শতাংশের মতো চাহিদা মেটানো হয় ওই অঞ্চল থেকে।

• এই সামুদ্রিক পথটি আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ খনিজতেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের এটিই একমাত্র পথ।

• বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পরিবহনে প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যধিক।

• কাতার যেহেতু বিশ্বের অন্যতম বড় তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) উৎপাদক, সেহেতু ওই গ্যাসের প্রায় পুরোটাই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বহির্বিশ্বে রফতানি করা হয়।

• হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের বেশির ভাগই এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন- ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি শিল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানির সিংহভাগ এ প্রণালী দিয়ে যায়।

• হরমুজ প্রণালী হচ্ছে ইরানের জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

• হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের মতো তেলজাত দ্রব্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে আছে তরলীকৃত গ্যাসও।

• এ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশ্ব পরাশক্তিগুলো অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এজন্য ইরান ব্যতীত আশেপাশের দেশে বিদেশী শক্তির সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করা যায়।

• হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তায় এ প্রণালী দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীসহ বিভিন্ন রনতরী।

হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা আর আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে হরমুজ প্রণালী আংশিকও যদি বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ব জালানি বাজার ওলট পালট হয়ে যাবে। তবে এ রুটটি বন্ধ হলে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে ইরানের অর্থনীতি তেমনি ক্ষতিগ্রস্থ হবে ইরানের প্রধান মিত্র চীনের অর্থনীতি।

HN
আরও পড়ুন