হাঙ্গেরির নির্বাচনে ট্রাম্পের বন্ধু ওরবানের গদি টালমাটাল

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

‘ভিক্টর ওরবান একজন সত্যিকারের বন্ধু, যোদ্ধা এবং বিজয়ী। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার জন্য তার প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে’ গত মাসে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এভাবেই হাঙ্গেরির কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের গুণগান গেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্পের এই ব্যাপক জনসমর্থনও কি শেষ পর্যন্ত ওরবানকে রক্ষা করতে পারবে?

আগামী ১২ এপ্রিল হাঙ্গেরিতে সংসদীয় নির্বাচন। দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা ওরবানের জন্য এবারের লড়াইটা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। জনমত জরিপ বলছে, ওরবানের দল ‘ফিদেজ’ (Fidesz) বর্তমানে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগয়ার এবং তার দল ‘তিসজা’ (Tisza)-এর চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। হাঙ্গেরির রাজনীতিতে এখন প্রশ্ন এটি নয় যে বিরোধী দল জিততে পারবে কি না, বরং প্রশ্ন হলো ওরবান কি তার পরাজয় মেনে নেবেন?

ভিক্টর ওরবান বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থী এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের কাছে এক আইকনিক চরিত্র। ২০১৪ সালে তিনি ‘ইললিবারাল স্টেট’ বা উদারতাবাদ-বর্জিত রাষ্ট্রের ধারণা প্রবর্তন করেন। তার শাসনামলে স্বাধীন বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে মুক্ত সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট হাঙ্গেরিকে আর ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে মানতে অস্বীকার করে এবং দেশটিকে ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’ বা নির্বাচনী একনায়কতন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করে।

ওরবানের সমর্থনে বিশ্বের প্রভাবশালী ডানপন্থী নেতারা একজোট হয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ফ্রান্সের মেরিন লে পেন সবাই ওরবানের পক্ষে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। লে পেনের মতে, ওরবানের মতো নেতাদের কারণেই ইউরোপে দেশপ্রেমিকদের জয়জয়কার শুরু হয়েছে।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাসের মুখে পড়েছেন ওরবান। নিজেকে কট্টর হাঙ্গেরীয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে দাবি করলেও, আন্তর্জাতিক ডানপন্থী জোট বজায় রাখতে গিয়ে তিনি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটারদেরই ক্ষুব্ধ করেছেন।

২০১০ সালে ওরবান প্রতিবেশী দেশগুলোতে বসবাসকারী হাঙ্গেরীয় সংখ্যালঘুদের ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়েছিলেন। সেই থেকে এই বিশাল জনগোষ্ঠী তাকে অন্ধভাবে সমর্থন করে আসছিল। কিন্তু গত বছর রোমানিয়ার নির্বাচনে ওরবান এমন এক কট্টর ডানপন্থী প্রার্থীকে সমর্থন দেন, যিনি স্বয়ং হাঙ্গেরীয় বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। এর ফলে রোমানিয়ায় থাকা হাঙ্গেরীয় সংখ্যালঘুরা ওরবানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরোধী পক্ষকে ভোট দেয়। একই ঘটনা ঘটেছে স্লোভাকিয়ার ক্ষেত্রেও।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ওরবান বা ট্রাম্পের মতো নেতাদের কাছে ‘জাতি’ বা ‘জনগণ’ শব্দের চেয়েও বড় অগ্রাধিকার হলো তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকিয়ে রাখা। উদারনৈতিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তারা অনেক সময় নিজেদের দেশের বা জনগণের স্বার্থকেও বিসর্জন দিচ্ছেন। এই ‘স্বৈরতান্ত্রিক ঝোঁকই’ হয়তো আসন্ন নির্বাচনে ওরবানের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

হাঙ্গেরির এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল দেশটির জন্যই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্যও এক বড় সংকেত হবে।

DR/SN
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত