যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধেও যেভাবে ভারতে পৌঁছাচ্ছে ইরানি তেল

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০২ এএম

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারতের মুম্বাই বন্দরে পৌঁছাচ্ছে তেল ও এলপিজিাবাহী ট্যাঙ্কার। ইরানকে কাবু করতে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি ‘শাটডাউন’ করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে মার্কিন নৌ-শক্তির সীমাবদ্ধতা ফুটে উঠছে। ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েন সত্ত্বেও ডজন ডজন ট্যাঙ্কার এই অবরোধ ভেদ করে যাতায়াত করছে।

অবরোধ ভেঙে যেভাবে চলছে বাণিজ্য

গত ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন অবরোধের পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪টি ইরানি সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কার এই পথ অতিক্রম করেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো ভারতীয় জাহাজ ‘দেশ গরিমা’। গত বুধবার কাতারের রাস লাফান থেকে ৯৭,০০০ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি মুম্বাই বন্দরে নোঙর করে। যদিও যাত্রাপথে জাহাজটি ইরানি বাহিনীর গুলির মুখে পড়েছিল, তবুও এটি সফলভাবে গন্তব্যে পৌঁছায়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৪টি ভারতীয় জাহাজ হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে অবস্থান করছে। এছাড়া তেহরান বা নয়াদিল্লি নিশ্চিত না করলেও, বেশ কিছু অ-ভারতীয় জাহাজ ইরান থেকে ভারতে তেল নিয়ে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

কোন পথে আসছে জাহাজগুলো?

বিশেষজ্ঞরা মূলত দুটি বিকল্প রুটের কথা বলছেন যা ব্যবহার করে জাহাজগুলো মার্কিন নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে:

১. ইরান-পাকিস্তান উপকূলীয় রুট: ফিন্যান্সিয়াল বিশ্লেষক জিম বিয়ানকো এবং মারিও নাউফাল একটি মানচিত্র শেয়ার করে জানিয়েছেন, জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা (Territorial Waters) ঘেঁষে চলাচল করছে। এরপর সেগুলো সরাসরি পাকিস্তানের মাকরান উপকূলীয় জলসীমায় প্রবেশ করে। যেহেতু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশের নিজস্ব জলসীমায় অন্য দেশের অনুমতি ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তাই এই পথটি তুলনামূলক নিরাপদ।

২. চাবাহার পোর্ট রুট: জাহাজগুলো ইরানের উপকূল ধরে এগিয়ে চাবাহার বন্দরের কাছে পৌঁছায়। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করে সরাসরি ভারতের পশ্চিম উপকূলের (মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা কেরালা) দিকে যাত্রা করে।

পাকিস্তান রুট ও ভারতের আইনি জটিলতা

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী, যেকোনো দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজস্ব জলসীমায় অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ বা শান্তিপূর্ণ চলাচলের অধিকার পায়। তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারতীয় জাহাজগুলোর জন্য পাকিস্তানের জলসীমা ব্যবহার করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিথান জানান, তাত্ত্বিকভাবে ভারতীয় জাহাজ পাকিস্তানের জলসীমা ব্যবহার করতে পারলেও বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। গত বছর পহেলগাম হামলার পর দুই দেশই একে অপরের পতাকাবাহী জাহাজের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে এই রুটটি ভারতীয় জাহাজের জন্য সবসময় সহজ নয়।

ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘নিভৃত’ ভূমিকা

একজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় নৌ-কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতীয় নৌবাহিনী এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শান্ত ভূমিকা পালন করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মাধ্যমে জাহাজগুলোর যাতায়াত নিশ্চিত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ওমান উপসাগরের একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে (Rendezvous point) ভারতীয় নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। ফলে জাহাজগুলোর জন্য পাকিস্তানের জলসীমায় ঢোকার প্রয়োজন পড়ে না।

অবরোধের সীমাবদ্ধতা ও ট্রাম্পের দাবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধকে ‘বিরাট সাফল্য’ দাবি করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ পর্যন্ত ২৮টি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং কিছু জাহাজ জব্দ করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক যুগে কোনো নৌ-অবরোধই শতভাগ নিশ্ছিদ্র করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন জাহাজগুলো কোনো দেশের সার্বভৌম জলসীমা ব্যবহার করে, তখন মার্কিন বাহিনীর করার কিছু থাকে না।

ইরানি তেলের এই প্রবাহ প্রমাণ করছে যে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতসহ আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজে নিতে সক্ষম। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

YA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত