ইরানের মাটিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এক গোপন সামরিক অভিযানের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারে এই অতর্কিত হামলা চালায় আমিরাত। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলার ফলে শোধনাগারটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যার প্রভাবে দীর্ঘ কয়েক মাস সেখানে জ্বালানি উৎপাদন ও শোধনের সিংহভাগ কার্যক্রম সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল।
হামলাটি চালানো হয়েছিল এপ্রিলের শুরুতে। ঠিক সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহের বিমান হামলার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছিলেন।
ইউএই প্রকাশ্যে এসব হামলার কথা স্বীকার করেনি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বলেছে, প্রয়োজনে সামরিকভাবে হলেও শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসও সরাসরি ইউএইর ভূমিকা নিয়ে কিছু বলেনি। তবে তারা জানিয়েছে, ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ বজায় রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক দিনা এসফানদারি বলেন, ‘উপসাগরীয় একটি আরব দেশের সরাসরি ইরানে হামলা চালানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তেহরান এখন আমিরাতের সঙ্গে অন্যান্য আরব দেশের দূরত্ব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করবে, বিশেষ করে যারা এই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করছে।’
যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো বলেছিল, ইরানে হামলার জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেবে না।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাল্টা জবাব দিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান। এর উদ্দেশ্য ছিল হামলাকারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে ইউএইর ওপর। দেশটির দিকে ২ হাজার ৮০০–এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের চেয়েও বেশি হামলার মুখে পড়েছে ইউএই।
এসব হামলার কারণে ইউএইর বিমান চলাচল, পর্যটন ও আবাসন খাত বড় ধাক্কা খেয়েছে। কর্মী ছাঁটাইও বেড়েছে।
উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব ঘটনার পর ইউএই এখন ইরানকে এমন একটি ‘বেপরোয়া রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখছে, যারা দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো দুর্বল করতে চায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটি পুরো যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোরালো সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ইউএই শুরুতে যুদ্ধ চায়নি। তবে ইরান দেশটির ওপর প্রথম হামলা চালানোর পর তারা বুঝতে পারে, আঞ্চলিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
এইচ এ হেলিয়ার আরও বলেন, ‘আবুধাবি কোথায় বা কী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে—এমনকি আদৌ কোনো হামলা চালিয়েছে কি না— সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই এটা মনে হচ্ছিল, বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
মার্চের মাঝামাঝি থেকেই ইরান যুদ্ধে ইউএইর সম্পৃক্ততা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। তখন ইরানের আকাশে এমন একটি যুদ্ধবিমান দেখা যায়, যা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে হয়নি।
উন্মুক্ত তথ্য ও ছবি গবেষকেরা পরে এমন কিছু ছবি শনাক্ত করেন, যেখানে ফরাসি নির্মিত মিরাজ যুদ্ধবিমান ও চীনের উইং লুং ড্রোন দেখা যায়। এই দুটি সমরাস্ত্রই ইউএই ব্যবহার করে।
সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউএই অনেক ছোট। তবে দেশটির বিমানবাহিনীকে অত্যন্ত দক্ষ ও আধুনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইউএইর কাছে রয়েছে মিরাজ ও অত্যাধুনিক এফ–১৬ যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি ড্রোন এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও রয়েছে।
ডেজার্ট স্টর্ম অভিযানের এয়ার ক্যাম্পেইন পরিকল্পনাকারী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভ ডেপটুলা বলেন, ‘নিখুঁত হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও রসদ ব্যবস্থাপনায় তারা (ইউএই) খুবই শক্তিশালী।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘এত সক্ষম বিমানবাহিনী থাকার পরও তারা ইরানের হামলা চুপচাপ সহ্য করবে কেন?’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএই শুধু সামরিক হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবের খসড়াকে সমর্থন জানিয়েছে। ওই প্রস্তাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য ভাঙতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুবাইয়ে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু স্কুল ও ক্লাব বন্ধ করে দিয়েছে ইউএই। ইরানি নাগরিকদের ভিসা ও ট্রানজিট সুবিধাও সীমিত করেছে।
এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইউএই থেকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা ইরান পেত, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানও বারবার অভিযোগ করেছে, ইউএই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যোগ দিয়েছে।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের তাণ্ডব
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখন 'লাইফ সাপোর্টে': ট্রাম্প
তেহরানের জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব, সংকটে সাধারণ মানুষ