ইরান-আমেরিকার ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ যে কারণে কখনোই থামবে না!

আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

আমেরিকা-ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কোনো একক চুক্তি বা মার্কিন প্রশাসনের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তার পরবর্তী যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের চেয়েও ইরানের এই চ্যালেঞ্জ দীর্ঘস্থায়ী হবে। গত কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদল হলেও তেহরানের বৈপ্লবিক আদর্শ ও মধ্যপ্রাচ্য নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। আর এটাই এই চিরন্তন লড়াইকে জিইয়ে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং প্রখ্যাত বিশ্লেষক ব্রেট এইচ. ম্যাকগার্কের বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, যখন কোনো দেশের নেতৃত্ব তাদের দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে এবং তা অর্জনে বারবার লড়াইয়ের পথে হাটে; তখন তাদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নীতি প্রযোজ্য এবং দেশটির দীর্ঘ ৪৭ বছরের গতিপথ পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই।

হোয়াইট হাউসে যখনই কোনো নতুন প্রশাসন আসে, তখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য মোকাবিলার কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত কূটনীতিকে প্রাধান্য দেন। বারাক ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তিকে যুদ্ধ এড়ানোর সেরা উপায় হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ ও সামরিক প্রতিরোধের পক্ষে সওয়াল করেন। তবে এই দুই কৌশলের কোনোটিই ইরানের মূল বৈপ্লবিক চরিত্রকে বদলে দিতে পারেনি।

ইরানের সংবিধানে ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-কে কেবল প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী হিসেবে রাখা হয়নি, বরং তাদের দেওয়া হয়েছে এক বিশেষ আদর্শিক মিশন। তেহরানের নেতৃত্ব এই মিশনকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা বহিষ্কার এবং ইসরায়েলকে ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ১৯৭৯ সালের মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে আজকের প্রক্সি নেটওয়ার্ক গঠন, সবই এই একই দর্শনের অংশ।

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের অনেকেই আশা করেছিলেন যে অর্থনৈতিক সুযোগের বিনিময়ে হয়তো ইরানের বিপ্লবী মনোভাব কিছুটা নরম হবে। বারাক ওবামার ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সেই উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল এবং সাময়িকভাবে তা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কিছুটা সীমিত করতে পেরেছিল। তবে চুক্তি পরবর্তী সময়ে তেহরানের আঞ্চলিক আচরণে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি বরং বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার পর তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলা ছিল ইরানের এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরই সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ। বহু বছর ধরে ইরানের অর্থ ও অস্ত্রে পুষ্ট হামাস এই হামলা চালানোর পর তেহরান একে প্রতিরোধের বড় সাফল্য হিসেবে উদযাপন করে। এর পরপরই ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়ারা একযোগে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে ফ্রন্ট খুলে দেয়, যা মূলত ইরানের বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টির কৌশলের প্রমাণ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এসবের ফলে সাময়িক কিছু কৌশলগত সাফল্য এলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়নি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলা ইরানের সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করতে পারলেও তেহরানের কট্টরপন্থী ব্যবস্থার ভিত এখনো বেশ শক্ত।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা নতুন করে পরমাণু চুক্তি করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইরানের দরকষাকষির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজজতবা খামেনির কঠোর বার্তা এবং হরমুজ প্রণালীতে আইআরজিসির নতুন করে মাইন পাতার ঘটনা প্রমাণ করে যে এই সংঘাতের কোনো সহজ সমাধান নেই। যতদিন ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন না আসবে, ততদিন এই উত্তেজনা, সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং পুনরায় সংঘাতের চক্র চলতেই থাকবে।

NB
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত