আফগানিস্তানে গোপন স্কুল, যেভাবে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

তালেবান সরকারের নিষেধাজ্ঞায় আফগানিস্তানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ হারাতে নারাজ অনেক কিশোরী ও তরুণী। তালেবানের নজর এড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গোপন স্কুল, যেখানে ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা।

সম্প্রতি এসব গোপন স্কুলের কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দেখেছেন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকরা। ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পেরেছেন, তালেবানের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। নিরাপত্তার কারণে তাদের অনেকেই শুধু প্রথম নাম ব্যবহার করেছেন।

গোপন কক্ষে চলছে ক্লাস

১৮ বছর বয়সী আয়েশা এমনই একটি গোপন স্কুলের শিক্ষার্থী। সপ্তাহে ছয় দিন সেখানে ক্লাস করেন তিনি। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান পড়ার স্বপ্ন দেখলেও তালেবানের নিষেধাজ্ঞায় সেই স্বপ্ন থেমে যায়। এখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরে লুকানো শ্রেণিকক্ষে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

কিছু স্কুলে গোপন শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আড়ালে। কোথাও আবার বাড়ির ভেতরে, বেসমেন্টে কিংবা ছোট পরিসরের ব্যক্তিগত জায়গায় পাঠদান চলছে। তালেবানের নজরদারি এড়াতে শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদা পথে স্কুলে যায় এবং দলবদ্ধভাবে চলাফেরা এড়িয়ে চলে।

কখনো তালেবান কর্মকর্তারা আকস্মিকভাবে স্কুলে প্রবেশ করলে শিক্ষকদের সতর্ক করতে ওয়াকিটকি ব্যবহার করা হয়। কোথাও বিশেষ ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করা হয়। এমনকি কয়েকটি স্কুলে নিরাপত্তার কারণে শিক্ষার্থীদের গোপন কক্ষে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।

অনলাইনেও চলছে শিক্ষা

শুধু গোপন শ্রেণিকক্ষ নয়, অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমেও আফগান মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষার ব্যবস্থা করছে। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এতে যুক্ত হচ্ছেন।

কিছু মেয়েকে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, কম্পিউটার ও অন্যান্য আধুনিক বিষয় পড়ানো হচ্ছে। কোথাও আবার শিক্ষার্থীরা দিনে সরাসরি ক্লাস করার পাশাপাশি রাতে অনলাইনে বিদেশি শিক্ষকদের কাছ থেকেও পাঠ নিচ্ছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির পর বন্ধ দরজা

২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে এই নিষেধাজ্ঞা আরও স্পষ্টভাবে কার্যকর হয়। এর ফলে লাখ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অন্তত ১৫ লাখ মেয়ের ওপর ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষার নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়েছে।

কিছু শিক্ষার্থী তাই ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করার পরও স্কুলে থাকার জন্য পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে অকৃতকার্য হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ভয়—সপ্তম শ্রেণিতে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে শিক্ষাজীবন সেখানেই শেষ হয়ে যাবে।

মাদ্রাসা বিকল্প হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে

তালেবান সরকার বয়স্ক মেয়েদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাকে একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও ইংরেজি পড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতের মতো বিষয়গুলো অনেক সময় একত্র করে সীমিত পরিসরে পড়ানো হয় এবং ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের জন্য উন্নত পাঠ্যক্রমের সুযোগ কম।

শিক্ষকরাও আতঙ্কে

গোপন স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তালেবান সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর বহু শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। কেউ বিনা পারিশ্রমিকে, আবার কেউ কম বেতনে গোপন শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের পড়াচ্ছেন। শিক্ষকরা বলছেন, প্রতিদিন তাদের ভয় হয়—কখন না স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয় কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তারপরও অনেক শিক্ষক মনে করেন, মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে একটি পুরো প্রজন্ম ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাই নিজেদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েও তারা শিক্ষাদান চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষাই হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের ভাষা

আফগানিস্তানের গোপন স্কুলগুলো এখন শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নানা বাধা, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে একটি শ্রেণিকক্ষে বসা মানে শুধু বই পড়া নয়—নিজেদের ভবিষ্যৎ ধরে রাখার চেষ্টা।

শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানে, শিক্ষা শেষ করলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের সুযোগ সীমিত। তবু তারা পড়াশোনা ছাড়তে চায় না। কারণ তাদের বিশ্বাস, সুযোগ এলে নিজেদের জীবন ও দেশের ভবিষ্যৎ বদলানোর জন্য শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

সূত্র: বিবিসি

এমএজেড
আরও পড়ুন