২৭ ইরানি এয়ারলাইনে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বললো তেহরান

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ এএম

ইরানের ২৭টি এয়ারলাইনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তেহরান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের জাতিসংঘ দূত যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত গোলামহোসেইন দারজি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের বিমান চলাচল খাতকে লক্ষ্য করে মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এর মধ্যে ইরানের ২৭টি এয়ারলাইন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব বিমান সংস্থা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য অস্ত্র, সামরিক সদস্য ও অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে।

জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো চিঠিতে দারজি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জাতিসংঘ সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষ করে মানবাধিকার আইন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে এসব নিষেধাজ্ঞা সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেন তিনি।

ইরানি রাষ্ট্রদূতের অভিযোগ, বিমান চলাচল খাতকে ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ফলে এর প্রভাব শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সামরিক কাঠামোর ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ইরানের বেসামরিক জনগণ নয়; বরং এমন বিমান সংস্থা ও মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক, যেগুলো ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ওয়াশিংটন মনে করে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পদক্ষেপের আওতায় তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতাকারী ও সরবরাহকারী নেটওয়ার্কও রয়েছে।

২৭ এয়ারলাইনে একযোগে নিষেধাজ্ঞা

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন পদক্ষেপের আওতায় রয়েছে- Air Shiraz, Ata Airlines, Iran Aseman Airlines, Iran Air Tour, Kish Air, Qeshm Air, Sepehran Airlines, Taban Airlines, Varesh Airlines, Zagros Airlinesসহ মোট ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থা।

এ ছাড়া তুরস্ক, মালয়েশিয়া, কাজাখস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তা করেছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ইরানের বিমান চলাচল খাতকে ঘিরে আগে অনুমোদিত কয়েকটি লেনদেন ও বিমান পরিচালনা-সংক্রান্ত ছাড়ও স্থগিত করা হয়েছে।

‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বললেন আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হুমকির সমালোচনা করেছিলেন।

আগস্টে এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ব্যর্থ নীতি দ্বিগুণভাবে প্রয়োগ করলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আরও পরাজয় ডেকে আনবে এবং ইরানিদের মধ্যে শত্রুতা বাড়াবে। তাঁর অভিযোগ ছিল, মার্কিন ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।

তেহরানের এই অবস্থান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির বিরোধিতারই ধারাবাহিকতা।

ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন

নতুন বিমান নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অংশ। এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতির অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আয় ও বাণিজ্যিক সংযোগগুলোকে আরও সংকুচিত করা।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক সংঘাত তীব্র হওয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে; মুদ্রার দরপতন, আমদানি সংকোচন ও মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সাধারণ মানুষের ওপর কতটা প্রভাব পড়বে?

ইরানের বিমান চলাচল খাত দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সংকটে রয়েছে। পুরোনো উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে বিমান চলাচলের ব্যয় বাড়া, ফ্লাইট কমে যাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক সংযোগ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে ইরানের সরকারকে চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের ওপরও এসে পড়তে পারে।

সংঘাতের নতুন মাত্রা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ইতোমধ্যে অর্থনীতি, তেলবাজার ও সমুদ্রপথ ছাড়িয়ে বিমান চলাচল খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরান এসব পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরছে।

এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

ইরানের জাতিসংঘ দূতের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ মন্তব্য তাই শুধু একটি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চাপ নীতির বিরুদ্ধে তেহরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন।

সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই প্রশ্ন উঠবে—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কি ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনবে, নাকি দুই দেশের মধ্যে প্রতিশোধ ও পাল্টা চাপের চক্র আরও দীর্ঘ করবে?

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত