যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের একটি অংশ আরও কঠোর সামরিক ও পারমাণবিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের হিসাব, পিছিয়ে যাওয়ার চেয়ে সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই তেহরানের জন্য এখন বেশি কার্যকর কৌশল।
তবে এই কৌশল ইরানের জন্য কতটা বাস্তবসম্মত, আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। কারণ একদিকে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ চাপের মুখে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ছাড়িয়ে সংঘাতের পরিধি বাড়ছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন চাপও তীব্র হচ্ছে।
ইরানের পার্লামেন্টে অতি রক্ষণশীল আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ তাকি নাঘদালি লেবাননের হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল হওয়া থেকে ঠেকাতে শক্তিশালী পাল্টা পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির মুখপাত্র হাসান গাশঘাভিও ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ বাড়ানোর জন্য নতুন পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
কট্টরপন্থী আরও কয়েকজন নেতা এর চেয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা NPT থেকে ইরানের বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অবশিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বন্ধ এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
হরমুজে সরাসরি সংঘাত
উত্তেজনার মাত্রা বোঝা যায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির সাম্প্রতিক দাবিতে। বৃহস্পতিবার বাহিনীটি জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজ, আটটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং আরও ১০টি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানি বাহিনীর দাবি, পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবেই এসব আক্রমণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সংঘাত এখন শুধু স্থল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নেই; বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিও সরাসরি সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
অর্থনীতিতে ভয়াবহ চাপ
তেহরানের কট্টরপন্থীদের কঠোর অবস্থানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অবশ্য দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। আগস্টের শেষ দিকে শেষ হওয়া এক বছরের হিসাবে ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দরও রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের ব্যয়, তেল বাণিজ্যে বাধা এবং নিষেধাজ্ঞার চাপের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
তারপরও কট্টরপন্থীদের যুক্তি হলো, সামরিক চাপ যত বাড়ানো যাবে, তত বেশি কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্ভব হবে। তাঁদের হিসাব, নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা আরও চাপে পড়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর এমন ব্যয় চাপিয়ে দিতে হবে, যাতে ওয়াশিংটন সমঝোতার দিকে যেতে বাধ্য হয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি নতুন ঝুঁকিতে
এরই মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরেও চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) বোর্ড অব গভর্নরস চলতি সপ্তাহে ইরানের পারমাণবিক অপ্রসারণ-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়েছে। দুই দশকের মধ্যে এটিই প্রথম এমন পদক্ষেপ।
তেহরান অবশ্য এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের অভিযোগ, দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে পশ্চিমা দেশগুলো নতুন চাপ তৈরির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই অবস্থায় NPT থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক পরিদর্শন আরও সীমিত করার দাবি তেহরানের হাতে চাপ বাড়ানোর নতুন অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ফলও হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে পারে এবং নতুন সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পও এখনই আলোচনায় যাচ্ছেন না
ইরানের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘হতে পারে’। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে আলোচনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
এর পাশাপাশি ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর মার্কিন হামলা ও সমুদ্রপথে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলে সেটি শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফলে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ আরও কঠিন হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে ইরান মার্কিন চাপ প্রতিহত করে যেতে পারে এবং সংঘাত ট্রাম্পের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মেয়াদের বাকি সময় পর্যন্তও চলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেরও কি সীমাবদ্ধতা আছে?
তেহরানের কট্টরপন্থীদের হিসাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করা।
ইরানের সর্বশেষ জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সময় মার্কিন বাহিনীকে প্রায় ৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এতে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্যাট্রিয়টসহ উন্নতমানের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত মজুতের পরিমাণ গোপন রাখা হয়। তবে স্বাধীন বিশ্লেষণ ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে এসব ইন্টারসেপ্টরের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপের কথা উঠে এসেছে। নতুন করে উৎপাদন ও মজুত পূরণ করতেও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এখানেই ইরানের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ব্যবধান অনেক বড় হলেও তেহরান মনে করছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ওয়াশিংটনের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
ঝুঁকি কতটা?
তবে এই কৌশল ইরানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তেল রপ্তানিতে বিঘ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের ব্যয় সামলাচ্ছে। সংঘাত আরও বাড়লে এসব চাপ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তারপরও তেহরানের কট্টরপন্থীদের অবস্থান থেকে মনে হচ্ছে, তারা নিজেদের দুর্বলতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাও হিসাব করছে। তাঁদের ধারণা, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য যথেষ্ট সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় তৈরি করতে পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
সমস্যা হলো, এই কৌশলের শেষ সীমা কোথায়—তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। সংঘাত বাড়াতে থাকলে ইরান যেমন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখেও পড়তে পারে।
ফলে তেহরানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ‘আরও কঠোর হওয়া উচিত কি না’—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কূটনৈতিক পথ যখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, তখন ইরানের হাতে বাস্তবে আর কতগুলো কার্যকর বিকল্প অবশিষ্ট আছে। কট্টরপন্থীরা হয়তো মনে করছেন, সংঘাত বাড়ানোই সেই সীমিত বিকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু সেটিই শেষ পর্যন্ত ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদূর গড়ায় এবং উভয় পক্ষের সহনশীলতার সীমা কোথায় গিয়ে শেষ হয় তার ওপর।
খামিস মুশাইত ও আবহায় হুথি হামলার আশঙ্কা কেটে গেছে: সৌদি আরব
২৫ হাজার বছর আগেও মানুষ মাদক ব্যবহার করতো: গবেষণা
জেলেনস্কির বিমানে ড্রোনের হুমকি ছিল ‘কাল্পনিক’: ক্রেমলিন
বাব আল-মান্দাব প্রণালি দখলের হুমকি দিলো হুথি, চাপে মার্কিন বাহিনী
ইসরায়েলি বিমান হামলায় কেঁপে উঠলো দক্ষিণ লেবানন