কানাডা-ইউক্রেনের ১০০ বছরের অংশীদারিত্বের ঘোষণা

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪২ এএম

ইউক্রেনের সঙ্গে আগামী ১০০ বছরের জন্য অংশীদারত্ব গড়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক অনুষ্ঠানে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণা সই করেছেন।

সই অনুষ্ঠানের পর ক্যালগেরিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কার্নি বলেন, দুই দেশের এই চুক্তির লক্ষ্য শুধু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা নয়; বরং ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি করা।

কার্নি বলেন, “প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং আমি ১০০ বছরের অংশীদারত্বের একটি ঘোষণা সই করেছি।” আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পুনর্গঠন, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং প্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইউক্রেনের সঙ্গে ক্যালগেরির ঐতিহাসিক ও জনসম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জানান, আলবার্টা প্রদেশে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি কানাডীয় বসবাস করেন। এর মধ্যে ক্যালগেরিতেই রয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার। শহরটির উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সাউদার্ন আলবার্টা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানকেও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

ইউক্রেনের যুদ্ধকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের পর্যায়ে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন কার্নি। তার দাবি, ইউক্রেন এখন ৬০০ কিলোমিটার বা ৩৭৩ মাইলেরও বেশি দূর থেকে আসা আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর সহায়তায় তার সামরিক সক্ষমতা পুনরায় জোগান দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কানাডার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় ড্রোনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান কার্নি। তার ভাষ্য, গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কানাডা বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।

বর্তমানে কানাডার সশস্ত্র বাহিনীর কাছে প্রায় ২ হাজার ড্রোন রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তবে আগামী বছরগুলোতে এ সংখ্যা “কয়েক মিলিয়নে” নেওয়ার প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দেশের অভ্যন্তরে ড্রোন উৎপাদন বাড়াতে চলতি বছরের শুরুতে কানাডা ‘ডিফেন্স ড্রোন ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে। এরই অংশ হিসেবে সামরিক ইউনিটগুলোকে প্রায় ৪০০ কানাডীয় সরবরাহকারীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে একটি জাতীয় ড্রোন মার্কেটপ্লেস চালুর ঘোষণা দেন কার্নি।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যে কয়েক মিলিয়ন ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। কার্নি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ের চুক্তিগুলো ড্রোনের প্রাপ্যতা ১০ গুণ বাড়াবে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিফেন্স ড্রোন ইনিশিয়েটিভ মার্কেটপ্লেস সাপ্লাই অ্যারেঞ্জমেন্ট’ নামে একটি জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। ইউক্রেনের ‘ব্রেভ১’ ব্যবস্থার আদলে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানববিহীন প্রযুক্তি ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম দ্রুত শনাক্ত, কেনা এবং সামরিক বাহিনী ও কোস্ট গার্ডে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।

প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ৫ কোটি কানাডীয় ডলারের চুক্তি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কানাডার সশস্ত্র বাহিনীতে মোতায়েন ড্রোনের সংখ্যা ১০ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এদিকে কানাডার জেনারেল ডায়নামিক্স মিশন সিস্টেমস-কানাডা ও ইউক্রেনের গ্রিন টেক হারভেস্টের মধ্যে ড্রোন উন্নয়ন ও উৎপাদনে নতুন অংশীদারত্বের কথাও জানানো হয়েছে।

ইউক্রেনকে হাইব্রিড হুমকি মোকাবিলায় প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। পাশাপাশি শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউক্রেনের জ্বালানি খাতে কয়েকশ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সহায়তার কথাও জানানো হয়েছে।

কানাডা-ইউক্রেন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার আওতায় ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাম্পস্টার্ট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে। কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনকে সুরক্ষা দিতে এ প্যাকেজের মূল্য ৩৫ কোটি ডলার।

এ ছাড়া ইউক্রেনীয় যুদ্ধবীরদের সহায়তায় সর্বোচ্চ ৪ কোটি ১০ লাখ কানাডীয় ডলার এবং নির্বাসিত ইউক্রেনীয় শিশুদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কানাডা।

২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনের জন্য কানাডার মোট প্রতিশ্রুত সহায়তার পরিমাণ এখন ২৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার ছাড়িয়েছে, যা প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

দুই দেশের নেতাদের ঘোষণায় স্পষ্ট হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান সামরিক বাস্তবতার পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতাকেও সামনে রাখছে কানাডা। ১০০ বছরের অংশীদারত্বের ঘোষণার মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন