২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল। নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবন তখন প্রতিদিনের মতোই চলছিল। কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন, কেউ অফিসে দিনের কাজ শুরু করেছিলেন। আকাশে উড়ছিল যাত্রীবাহী বিমান। কেউই তখন জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, যার অভিঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বদলে দেবে বিশ্ব রাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ।
সেদিন আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। আরেকটি বিমান আঘাত করে ওয়াশিংটন ডিসির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
হামলায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন। অল্প কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সংঘটিত এই সন্ত্রাসী হামলা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
টুইন টাওয়ারে আঘাত
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটের দিকে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে। প্রথমে অনেকেই এটিকে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়, ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়।
সকাল ৯টা ৩ মিনিটের দিকে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি দেখতে পান, নিউইয়র্কের আকাশে ধোঁয়া এবং আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
দুটি ভবনেই তখন হাজারো মানুষ কর্মরত ছিলেন। আগুন, ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনেকে ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। উদ্ধারকারীরা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপক বাহিনী, পুলিশ ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মানুষকে উদ্ধারের কাজে অংশ নেন।
সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে দক্ষিণ টাওয়ারটি ধসে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর, সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে উত্তর টাওয়ারও ভেঙে পড়ে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বাণিজ্যিক স্থাপনা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
পেন্টাগনেও হামলা
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার কিছুক্ষণ পর আরেকটি ছিনতাই করা বিমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পেন্টাগনের দিকে এগিয়ে যায়।
সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটের দিকে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত করে। ভবনটির একটি অংশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে কর্মরত বহু মানুষ হতাহত হন।
পেন্টাগন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রতীক। ফলে সেখানে হামলা শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফ্লাইট ৯৩-এর শেষ অধ্যায়
চতুর্থ বিমানটি ছিল ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩। বিমানটি ছিনতাই হওয়ার পর যাত্রীরা ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন, অন্য বিমানগুলো দিয়ে কী ধরনের হামলা চালানো হয়েছে।
যাত্রী ও ক্রুরা তখন বুঝতে পারেন, তাদের বিমানটিও কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। কয়েকজন যাত্রী ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। বিমানের কোনো যাত্রী বা ক্রু বেঁচে থাকেননি। তবে যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণে ছিনতাইকারীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যস্থলে বিমানটি পৌঁছাতে পারেনি বলে তদন্তে উঠে আসে।
ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীদের সাহস পরবর্তী সময়ে ৯/১১-এর ইতিহাসে প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
কারা ছিল হামলার পেছনে?
হামলার জন্য দায়ী ছিল আল-কায়েদা। সংগঠনটির তৎকালীন নেতা ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক অভিযান চালায়। কারণ, আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন এবং সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা আফগানিস্তানে অবস্থান করছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ৯/১১-এর প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে।
বদলে যায় বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
৯/১১-এর আগে বিমানবন্দর নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যে কাঠামো ছিল, হামলার পর তা আমূল পরিবর্তিত হয়।
বিমানবন্দরে যাত্রী ও লাগেজ তল্লাশি কঠোর করা হয়। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অর্থায়ন বন্ধ করতে বিভিন্ন দেশে নতুন আইন ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’ কাঠামো শক্তিশালী করা হয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তা বিধিও আরও কঠোর হয়। একজন সাধারণ যাত্রীর জন্যও ৯/১১-এর পর বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে আগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’
৯/১১-এর পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘War on Terror’ বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ঘোষণা দেন। এর প্রথম বড় সামরিক অভিযান শুরু হয় আফগানিস্তানে।
কয়েক বছর পর ইরাক যুদ্ধও শুরু হয়। যদিও ইরাকের সঙ্গে ৯/১১-এর সরাসরি যোগসূত্র ছিল না, তবু সন্ত্রাসবিরোধী বৃহত্তর মার্কিন নীতির অংশ হিসেবে ইরাক যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
এই যুদ্ধগুলোর প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। লাখো মানুষ নিহত বা বাস্তুচ্যুত হন, বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়।
৯/১১-এর মানবিক মূল্য
৯/১১-এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল মানুষের জীবন। ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অফিসকর্মী, বিমানযাত্রী, অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, উদ্ধারকর্মী এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন।
অনেক পরিবার এক মুহূর্তে তাদের স্বজন হারায়। আবার উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজে অংশ নেওয়া বহু মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো পরিণত হয় স্মৃতির এক স্থানে। সেখানে নিহতদের নাম খোদাই করা হয়েছে। প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর সেখানে নিহতদের স্মরণ করা হয়।
২৫ বছর পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ ৯/১১?
২০০১ সালের সেই হামলার ২৫ বছর পরও ৯/১১ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বদলেছে, সামরিক জোটের ভূমিকা বেড়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি বিস্তৃত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ৯/১১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সন্ত্রাসী হামলার প্রভাব কেবল ঘটনাস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রের নীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর।
নিউইয়র্কের আকাশে সেই ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। পেন্টাগনের ক্ষতও অনেকটাই মেরামত হয়েছে। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের স্মৃতি এখনো বিশ্ববাসীর মনে অমলিন।
একটি সকাল কীভাবে একটি দেশের নিরাপত্তা চিন্তা বদলে দিতে পারে, কীভাবে একটি ঘটনা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দিতে পারে এবং কী ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের কারণে—৯/১১ তারই এক নির্মম স্মারক।
দুই যুদ্ধের মধ্যেই দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন
কঙ্গোতে স্কুলে আগুন, শিক্ষার্থীসহ নিহত ২৯
কানাডা-ইউক্রেনের ১০০ বছরের অংশীদারিত্বের ঘোষণা
ইউক্রেনে রুশ বিমান হামলায় বহুতল ভবনে আগুন