হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বৈঠক, যেসব সিদ্ধান্ত আসলো

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১ এএম

লোহিত সাগর ও ইয়েমেন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই হুথিদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওমানে বৈঠক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাসকাটে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ওমানের মধ্যস্থতায় আয়োজন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস ও রয়টার্স।

বৈঠকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

রয়টার্স-এর পাঁচটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হুথি প্রতিনিধিরা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলার পরিকল্পনা নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন এবং ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একটি ইয়েমেনি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি মালিকানাধীন জাহাজ ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা না করার কথাও বলা হয়েছে।

অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা বাব আল-মান্দাব দিয়ে অন্য জাহাজের চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে এসব বক্তব্য হুথিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত কোনো চুক্তি নয়; এগুলো বৈঠক সম্পর্কে অবহিত সূত্রের তথ্য।

বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।

বর্তমানে ইয়েমেনের সংঘাতের পাশাপাশি ইরান-সংক্রান্ত আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ—হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রয়টার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমেছে, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচল তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে।

বৈঠকের সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অগ্রসর হয়েছে এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি কয়েকটি কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার খবর এসেছে। একই সময়ে সৌদি ও তাদের সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে।

এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা চালানোর অনুরোধ করেছিলেন বলে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। ওয়াশিংটন সৌদিকে গোয়েন্দা তথ্য ও টার্গেটিং-সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবকে কিছু সহায়তা দিলেও ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে আঞ্চলিক অংশীদারদের নেতৃত্বে পরিস্থিতি মোকাবিলার নীতি অনুসরণ করছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মূল স্বার্থ হলো লোহিত সাগর ও বৃহত্তর অঞ্চলে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো।

তবে নির্দিষ্ট ওমান বৈঠক সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি পররাষ্ট্র দপ্তর। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও পরে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। ফলে মাসকাটের বৈঠকটি যে বিচ্ছিন্ন কোনো যোগাযোগ নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে ওমান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। হুথি ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকও ওমানের সহায়তায় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আল-বুসাইদির সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা নিয়েও আলোচনা করেছেন।

ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ ও জ্বালানি রপ্তানি রুট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একই সময়ে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এক লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের না জড়ানোর অবস্থান ইয়েমেন সংকটের একটি নতুন কূটনৈতিক মাত্রা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের জন্য এখন বড় প্রশ্ন—বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখা এবং একই সঙ্গে সৌদি–হুথি সংঘাতে সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানো—এই দুই লক্ষ্য কীভাবে একসঙ্গে বজায় রাখা যায়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন