বিশ্বের প্রথম ড্রোন সাবমেরিনের ‘মাদারশিপ’ বানাচ্ছে চীন

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম

পানির নিচে চলাচলকারী বিশাল আকারের ড্রোন বা মানবহীন সাবমেরিন বহনে সক্ষম একটি বিশেষ ‘মাদারশিপ’ তৈরি করছে চীন। স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে সাংহাইয়ের একটি শিপইয়ার্ডে জাহাজটির নির্মাণকাজের চিত্র ধরা পড়েছে। এটি বিশ্বের প্রথম এ ধরনের জাহাজ হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টরের ধারণ করা ছবিতে হুডং-ঝংহুয়া শিপইয়ার্ডে নির্মাণাধীন লাল রঙের জাহাজটি দেখা যায়। এর আগে চীনের বড় আকারের উভচর হামলাজাহাজ নির্মাণের জন্যও এই শিপইয়ার্ড পরিচিত। নতুন জাহাজটি একসঙ্গে অন্তত চারটি বিশাল আকারের স্বয়ংক্রিয় সাবমেরিন বহন করে সমুদ্রে মোতায়েন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এইচআই সাটনের মতে, জাহাজটির আকার ও নকশা বিশ্লেষণ করে এটিকে বিশেষ ধরনের ড্রোন সাবমেরিনের মাদারশিপ বলেই মনে হচ্ছে। তার ধারণা, জাহাজটির ভেতরের হ্যাঙ্গারে অন্তত চারটি চীনা বিশাল মানবহীন সাবমেরিন রাখা সম্ভব হবে। এসব সাবমেরিনকে বিশাল মানবহীন পানির নিচের যান বা এক্সএক্সএলইউইউভি বলা হচ্ছে। ধারণা করা হয় চীনই প্রথম দেশ, যারা এ ধরনের এত বড় মানবহীন সাবমেরিন তৈরি করেছে।

গত বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবার এসব বিশাল আকারের মানবহীন সাবমেরিনের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে। পরে দক্ষিণ চীন সাগরে হাইনান দ্বীপের উপকূলে এগুলোর পরীক্ষা চালানোর তথ্যও পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন মাদারশিপে এসব সাবমেরিন রাখার জন্য যে অভ্যন্তরীণ হ্যাঙ্গার রাখা হয়েছে, সেটি জাহাজটিকে সাধারণ বেসামরিক বা গবেষণামূলক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাকে অনেকটাই দুর্বল করে।

এখন পর্যন্ত চীনের দুটি ধরনের এক্সএক্সএলইউইউভি দেখা গেছে। একটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ ফুট এবং অন্যটির প্রায় ১৪৮ ফুট। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অরকা’ নামে পরিচিত মানবহীন পানির নিচের যানটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫১ ফুট। অর্থাৎ চীনের এসব নতুন ড্রোন আকারে অরকার প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বড়। চীনের নতুন মানবহীন সাবমেরিনগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আকারের সাবমেরিনে দীর্ঘ দূরত্বে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম বহনের সক্ষমতা থাকতে পারে।

অরকার পাল্লা প্রায় ৬ হাজার ৫০০ নটিক্যাল মাইল। দীর্ঘ দূরত্বে গোপন সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। চীনের এক্সএক্সএলইউইউভি আরও বড় হওয়ায় এর পাল্লা ও বহনক্ষমতা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে ব্রিটেনও ‘প্রজেক্ট সিটাস’-এর আওতায় ‘এক্সভি এক্সক্যালিবার’ নামে একটি বড় মানবহীন পানির নিচের যান তৈরি করেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৯ ফুট এবং এটি একবারে প্রায় ১ হাজার মাইল পর্যন্ত চলতে সক্ষম। চলতি বছরের জুলাইয়ে এর পানির নিচে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এটি কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চীনের নতুন এক্সএক্সএলইউইউভির তুলনায় ব্রিটিশ যানটি আকারে অনেক ছোট। নতুন চীনা মাদারশিপটির সামনের অংশের কাছেও একটি হ্যাঙ্গার দেখা গেছে। সেটি হেলিকপ্টার পরিবহনেও ব্যবহার করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের এই নতুন জাহাজ দেশটির দ্রুত সম্প্রসারিত নৌবাহিনী ও সামরিক জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার আরেকটি উদাহরণ। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণকারী দেশ চীন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, চীনের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অন্তত ২০০ গুণ বেশি। চীনের যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা প্রায় ৪০৫টি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে প্রায় ২৯৫টি।

চীনের সামরিক কৌশলে সমুদ্র বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেশটির প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সামরিক লক্ষ্যগুলোর বড় অংশই সামুদ্রিক অঞ্চলকে ঘিরে। তাইওয়ানকে চীনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি বেইজিং। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনও সামরিক সংঘাত হলে তা মূলত সামুদ্রিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ চীন সাগরেও সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়াচ্ছে চীন। অঞ্চলটির প্রায় সব দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও শিলার ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি করে বেইজিং। তবে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ব্রুনেই ও তাইওয়ানসহ কয়েকটি দেশ এসব দাবির বিরোধিতা করে আসছে। এসব বিরোধকে ঘিরে অতীতে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এসব বিরোধ আরও বড় সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।

চীন যখন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে, তখন অন্য দেশগুলোকেও আধিপত্যবাদ ও সামরিকতাবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। চীনের বার্ষিক শাংশান ফোরামে প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী দং জুন বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক বক্তব্যে বলেন, ইতিহাসের শিক্ষা মনে রেখে আধিপত্যবাদ, সামরিকতাবাদ ও ইতিহাসের পুনর্লিখনের সব ধরনের সম্ভাব্য প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্লেষকদের অনেকেই এই বক্তব্যকে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধে জড়িত জাপানের প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখছেন। জাপানও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে।
সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

জেএম
আরও পড়ুন