ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের পেছনে ৩ লক্ষ্য

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের পেছনে তিনটি সম্ভাব্য লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর ভাষায়, এর একটি হতে পারে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হওয়া, দ্বিতীয়টি ইরানি জনগণের মধ্যে গণঅভ্যুত্থান এবং তৃতীয়টি হলো—তেহরানকে কোনো সমঝোতায় রাজি করানো হলে সেই চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য করা।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, ইরানের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরির কৌশল তুলে ধরেন। ফক্স নিউজে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের বিস্তৃত উদ্দেশ্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির ফলাফল তিনটি সম্ভাব্য পথে যেতে পারে।

প্রথমত, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেই বিরোধ বা বিভাজন তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের কারণে ইরানের জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, তেহরান যদি আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়, তাহলে সেই চুক্তির শর্ত মেনে চলতে ইরানকে বাধ্য করা হতে পারে।

বেসেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়াচ্ছে এবং তেহরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে সীমিত করার চেষ্টা করছে।

তবে বেসেন্ট যে তিনটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন, সেগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে নয়, বরং তাঁর বর্ণিত সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের ওপর মার্কিন চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বিমান চলাচল। বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরান থেকে বাইরের দেশগুলোতে পরিচালিত অধিকাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের দেশে ফেরার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান খাতকে লক্ষ্য করে ৩৬টি নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের বিমান চলাচল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এটিকে তেহরানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। ৪ সেপ্টেম্বর একটি তুর্কি বিনিয়োগ ব্যাংক ও এর দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ইরান-সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

বেসেন্টের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের অর্থায়ন ব্যবস্থা। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বা দেশটির অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

ওয়াশিংটনের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের বৈদেশিক আয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এর ফলে ইরানের জন্য তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আগস্টেও বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন ইরানের রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোকে চাপে ফেলে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

ইরানের তেল পরিবহন ব্যবস্থাও মার্কিন চাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেসেন্টের সাক্ষাৎকারে ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, অধিকাংশ ট্যাংকার স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে।

তবে সামগ্রিকভাবে ইরানের তেল রপ্তানি ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রি, পরিবহন এবং অর্থপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে।

রয়টার্সের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীনভিত্তিক একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমে গত এক বছরে আনুমানিক ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার স্থানান্তর করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ধরনের ব্যবস্থা দেখাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান বিকল্প আর্থিক ও বাণিজ্যিক পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান আলোচনার মাধ্যমে সংকট কমানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। রয়টার্সের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়েও শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব সামনে এসেছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানান এবং একটি চুক্তি না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা—তিনটি পথই পাশাপাশি চলছে।

বেসেন্টের বক্তব্যে যে তিনটি সম্ভাবনার কথা এসেছে, তার প্রথম দুটি—শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন অথবা জনগণের অভ্যুত্থান—মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথের ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবর্তন বাইরের চাপের কারণে কতটা এবং কীভাবে ঘটবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

তৃতীয় সম্ভাবনাটি তুলনামূলকভাবে কূটনৈতিক—ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং সেই চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ যত বাড়ছে, ততই আঞ্চলিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি হামলা এবং সৌদি আরবকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক সংকটকে আরও জটিল করছে।

সব মিলিয়ে বেসেন্টের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশল শুধু ইরানের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। বিমান চলাচল, ব্যাংকিং, তেলবাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ—বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে চাপে রাখার মাধ্যমে তেহরানের ওপর প্রভাব তৈরির চেষ্টা চলছে।

তবে এই চাপ শেষ পর্যন্ত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন কোনো চুক্তি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত—কোন পথে নিয়ে যাবে, সেটি এখনো নির্ধারিত নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কূটনৈতিক সমঝোতার কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পায় কি না।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত