ইরান ও কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নীতি এবং বিদেশে সামরিক কর্মকাণ্ডে করদাতাদের অর্থ ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন। তাঁর বক্তব্য, বিদেশের যুদ্ধ ও চাপ প্রয়োগে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে বিনিয়োগ করা উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান হোলেন প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘America First’ নীতির সঙ্গে বিদেশে সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যয়ের এই প্রবণতা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি লেখেন, ইরানে হামলা এবং কিউবার জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের পরিবর্তে দেশের ভেতরেই ওই অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, “Enough is enough”—অর্থাৎ, ‘যথেষ্ট হয়েছে’।
ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে আগেও প্রশ্ন
ইরান ইস্যুতে ভ্যান হোলেনের অবস্থান নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি ও কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অংশগ্রহণ বন্ধের জন্য ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন সমর্থন করেন। রিপাবলিকানদের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ আটকে যায়।
জুলাইয়ে সিনেটের বক্তব্যেও ভ্যান হোলেন ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে এবং মার্কিন পরিবারগুলো এর আর্থিক চাপ অনুভব করছে। একই বক্তব্যে তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোরও সমালোচনা করেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হলো—বিদেশে সামরিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পরিবারগুলো মূল্যস্ফীতি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করছে, তখন সরকারি অর্থের অগ্রাধিকার কোথায় হওয়া উচিত।
‘America First’ নিয়ে প্রশ্ন
ভ্যান হোলেনের সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘America First’ নীতি। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি অর্থনৈতিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ব্যয় নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিদেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মার্কিন শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তবে ‘America First’ নীতির অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য বিদেশে সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে তুলে ধরে। বিপরীতে ভ্যান হোলেনসহ কিছু ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এসব পদক্ষেপের ব্যয়, আইনি ভিত্তি এবং দেশীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
কিউবা প্রসঙ্গ
ভ্যান হোলেনের সর্বশেষ মন্তব্যে কিউবাও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কিউবার সরকারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন এবং দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসন কিউবার ওপর দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বজায় রেখেছে।
ভ্যান হোলেনের বক্তব্যের অর্থ হলো, কিউবার ওপর চাপ প্রয়োগ কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ড—দুই ক্ষেত্রেই মার্কিন জনগণের অর্থ ব্যয়ের আগে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ওয়াশিংটনে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে বিতর্ক
ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিতর্ক ইতোমধ্যে আরও বিস্তৃত হয়েছে। জুলাইয়ে ভ্যান হোলেন বলেন, ২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনে প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরান যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রস্তাব একত্রে অনুমোদিত হলে মার্কিন করদাতাদের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের ব্যয়ের পক্ষে থাকা আইনপ্রণেতাদের যুক্তি হলো, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের ব্যয় শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণের ওপরই পড়ে এবং এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
বিতর্কের কেন্দ্রে করদাতার অর্থ
ভ্যান হোলেনের মন্তব্য মূলত একটি বৃহত্তর মার্কিন রাজনৈতিক বিতর্ককে সামনে এনেছে—দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশে কতটা অর্থ ব্যয় করা হবে এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কতটা সম্পদ বরাদ্দ করা হবে।
ইরান যুদ্ধ, কিউবার ওপর চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ এগুলোকে মার্কিন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এসব পদক্ষেপের আর্থিক ও মানবিক ব্যয় নিয়ে আরও কঠোরভাবে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
ভ্যান হোলেনের সর্বশেষ বক্তব্য সেই দ্বিতীয় অবস্থানকেই তুলে ধরেছে। তাঁর বার্তা স্পষ্ট—বিদেশে সামরিক কর্মকাণ্ডে করদাতার অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মার্কিন জনগণের দৈনন্দিন প্রয়োজন ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এই বিতর্ক এখনো চলমান। ইরান ও কিউবাকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান, কংগ্রেসের বাজেট সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়—এসব বিষয় আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের পেছনে ৩ লক্ষ্য
তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর