জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান, ফিলিস্তিন, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং ইউরোপের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন সমালোচকের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিনিধি সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত, গাজা যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনা নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করার সময়ই সভাকক্ষ থেকে প্রতিনিধিদের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনি বেরিয়ে যাওয়া প্রতিনিধিদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর বক্তব্যের সময় ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল ও গ্যালারিতে থাকা তাঁর সমর্থকদের কাছ থেকে করতালি ও সমর্থনের স্লোগান শোনা যায়।
ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জন্য এটি সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস না করলে ইসরায়েলসহ অন্যদের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতো।
এর এক দিন আগে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কথিত ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ সমালোচনা করেন। তিনি ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরেন।
নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে ইসরায়েলকে ‘সাত ফ্রন্টের যুদ্ধে’ লিপ্ত বলে বর্ণনা করেন। তাঁর তালিকায় ছিল গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, সিরিয়া, লেবানন, ইরান, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তিনি বলেন, ইসরায়েলকে জিততেই হবে এবং তাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।
ইসরায়েলের ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকেও ভাষণে আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। গাজা যুদ্ধ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে ঔপনিবেশিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ‘দুর্বলতা’ ও ‘তোষণ’ দেখাচ্ছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা চলতি মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে।
তবে একই ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। তাঁকে নিজের ‘বন্ধু’ উল্লেখ করে বলেন, ইসরায়েলের পক্ষে লড়াইয়ে ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার তারা পায়নি।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে কাজ করেছে এবং দুই দেশের পাইলটরা ইরানের আকাশে যৌথ অভিযান চালিয়েছেন। গাজা থেকে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও সরাসরি আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। এর আগে মামদানি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রচারণাও চালিয়েছিলেন, যদিও পরে মেয়র হিসেবে তাঁর এমন গ্রেপ্তারের আইনগত ক্ষমতা নেই বলে জানান।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহু মামদানির উদ্দেশে বলেন, তিনি তাঁকে নিউইয়র্কে আসতে বাধা দিতে এবং নীরব করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা পারেননি।
গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে—এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল গণহত্যা করেনি; বরং গণহত্যা ঠেকিয়েছে।
এর জবাবে মামদানি বলেন, নেতানিয়াহুর অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’। তাঁর বক্তব্য, এসব অভিযোগ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহু এমন সময় জাতিসংঘে ভাষণ দেন, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০২৪ সালে আইসিসি গাজা যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
অন্যদিকে একই অধিবেশনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর প্রতিনিধিদলের ভিসা প্রত্যাখ্যান করায় রামাল্লা থেকে পূর্বধারণকৃত ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেন।
নেতানিয়াহুর সফরকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশেও বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার প্রতিবাদ জানান। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করে।
ইহুদি সংগঠন Jewish Voice for Peace-এর কর্মীরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর ভাষণটি ইসরায়েলের দর্শকদের কাছেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এবং তাঁর বক্তব্যে সামরিক সাফল্য ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
Atlantic Council-এর বিশ্লেষক এরিয়েল কোহেন আল জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্যের অনেক বিষয় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চের চেয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারণায় বেশি উপযোগী। তাঁর মতে, বক্তব্যটির একটি বড় অংশ ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রোতাদের উদ্দেশে রাজনৈতিক বার্তা। এটি অবশ্য কোহেনের বিশ্লেষণ, কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি ব্যাখ্যা নয়।
নিউইয়র্ক সফরও ছিল নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার জন্য নিউইয়র্কে আসেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো নির্ধারিত বৈঠক ছাড়াই সফর শেষ করার কথা ছিল। বিশেষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো বৈঠক নির্ধারিত ছিল না।
ফলে এবারের জাতিসংঘ ভাষণ একদিকে যেমন ইসরায়েলের সামরিক নীতির পক্ষে নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য অবস্থান তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সভাকক্ষ থেকে প্রতিনিধিদের বেরিয়ে যাওয়া, নিউইয়র্কের বিক্ষোভ এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান বিতর্কও স্পষ্ট করেছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখে: জাতিসংঘে আব্বাস
মীর শাহে আলম নতুন হাওয়া ভবনের ম্যানেজার: সারজিস
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জরুরি সামরিক বৈঠক
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ সেল গঠন