ট্রাম্প-শি বৈঠকে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলো?

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ওয়াশিংটনে বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের মধ্যকার বেশ কিছু উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়কে আপাতত পাশে রেখে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ওপর জোর দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে শি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।

বৃহস্পতিবারের (২৪ সেপ্টেম্বর) বৈঠককে ট্রাম্প ‘দারুণ বৈঠক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইরান, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সংলাপ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ২০১৬ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় থেকেই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, যা পারস্পরিক সম্মান এবং দুই দেশের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

শির যুক্তরাষ্ট্র সফরের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা চারটি বিষয় হলো—

১. স্থিতিশীল সম্পর্কের ওপর জোর

ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর চীনা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে দ্রুত বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

তবে সেই উত্তেজনাপূর্ণ শুরুর পর ট্রাম্প ও শি দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তারা ব্যক্তিগত সম্পর্কও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। যদিও দুই দেশের মৌলিক বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো দ্রুত পরিবর্তন হবে—এমন প্রত্যাশা খুব বেশি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ট্রাম্প কখনো কখনো প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তবে চীনের উত্থান দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের দারুণ বৈঠক হয়েছে।’ তবে বৈঠকের বিস্তারিত তিনি জানাননি।

অন্যদিকে শি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচিত ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ এড়িয়ে চলার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় এই ধারণাটি একটি উদীয়মান শক্তি ও বিদ্যমান পরাশক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

শি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এমন প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত যেখানে একে অন্যকে পেছনে ফেলার চেষ্টা থাকবে, কিন্তু তা এমন লড়াই হওয়া উচিত নয় যেখানে একজনের জয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।

তার ভাষায়, দুই দেশ গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। তাই তাদের ‘সুস্থ’ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হওয়া উচিত এবং সেই প্রতিযোগিতা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা প্রয়োজন।

২. বৈঠকের ওপর ইরান যুদ্ধের ছায়া

শির সফরের প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হলেও দুই নেতার আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুও উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম ইরান যুদ্ধ।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।

ট্রাম্প চীনের প্রতি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় সহযোগিতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধের আগে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

তবে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এ বিষয়ে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে ইরান ইস্যুতে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। শি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল পরবর্তী সময়ে একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করা।

তবে জুনে ঘোষণা দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে।

৩. শির সফর নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

শির যুক্তরাষ্ট্র সফরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমক থাকলেও মার্কিন কংগ্রেসের কিছু ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দেশের নেতাকে এত জাঁকজমকপূর্ণভাবে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাকে মর্যাদা দিচ্ছে।

রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, হোয়াইট হাউস যদি তার পরামর্শ চাইত, তাহলে তিনি শিকে এত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে নিরুৎসাহিত করতেন। চীনের প্রেসিডেন্ট ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদ্ধতির সমালোচনা করেন। তার মতে, কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করলেই নিজের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে—ট্রাম্পের এমন ধারণা রয়েছে।

তবে সব মার্কিন আইনপ্রণেতা শির সফরকে নেতিবাচকভাবে দেখেননি। কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাব্য বড় সংঘাত এড়াতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, তিনি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় খুশি। তার মতে, কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ—‘আরও কথা, কম যুদ্ধ।’

৪. তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন শি

ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। স্বশাসিত এই দ্বীপকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনার কথাও বলেছেন তিনি।

তবে বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউসের নিজস্ব বিস্তারিত সারসংক্ষেপ তখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য বা অবস্থানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ্যে আসেনি।

চীনের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের উদ্বেগ আরও তুলে ধরা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পদক্ষেপ, যেটিকে চীন উসকানিমূলক মনে করে, তা এড়ানোর ওপর বেইজিং জোর দিয়ে আসছে।

এর আগে মে মাসে শির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজের চূড়ান্ত অনুমোদন স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে আলোচনায় অস্ত্র বিক্রয়কে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

ওয়াশিংটনের কিছু মহল অবশ্য এই লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, তাইওয়ানের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ নীতির অংশ।

তবে চীন ও তাইওয়ান—উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করে আসছে। একদিকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তাইওয়ান প্রণালির বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

তাইওয়ান আশঙ্কা করে, চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয় ধরনের চাপ প্রয়োগ করে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।

মে মাসে ইকোনমিস্ট/ইউগভ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা চীনের তুলনায় তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি। বেইজিংয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা নাকি চীনের তাইওয়ান দখল ঠেকানো—কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, এ প্রশ্নে ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা প্রথমটি এবং ৩৫ শতাংশ দ্বিতীয়টিকে সমর্থন করেন।

তবে ৪০ শতাংশেরও কম উত্তরদাতা বলেছেন, চীন তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে তা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো চূড়ান্ত সমাধান দেয়নি। বরং বৈঠকে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা, সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা এবং বাণিজ্য, ইরান ও তাইওয়ানের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার ওপর গুরুত্ব দেখা গেছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত