যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হলেও ইরান প্রতিরোধে অটল থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি যত ভয়াবহই হোক, এমনকি ‘ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ’ বা ‘ডুমসডে যুদ্ধের’ পর্যায়েও পৌঁছালে তেহরান তার অবস্থান থেকে সরে যাবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বাস্তব কূটনীতি’র জন্য ইরান প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি এসব কথা বলেন। এর আগে এনবিসি নিউজের ‘Meet the Press’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি একই অবস্থান তুলে ধরেন।
আরাগচি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আমি যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছিলাম।’ তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের মুখে ইরান দৃঢ় থাকবে, এমনকি পরিস্থিতি ‘অ্যাপোক্যালিপটিক যুদ্ধের’ দিকে গেলেও।
এর পরই তিনি যোগ করেন, ‘একই সময়ে আমরা বাস্তব কূটনীতির জন্য প্রস্তুত।’
আরাগচির বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত পূরণের বিনিময়ে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক ইস্যুসহ বৃহত্তর সমঝোতার আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেও ইরান বলছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো তারা পায়নি। ফলে তেহরান প্রকাশ্য মার্কিন বক্তব্যের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তারও অপেক্ষা করছে।
আরাগচি এনবিসিকে বলেন, ইরান একই সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং কূটনীতির জন্যও প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর।
হরমুজ নিয়ে ইরানের প্রস্তাব
ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল হরমুজ প্রণালি। তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানো, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিলে হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়া যেতে পারে।
আরাগচি বলেছেন, এসব দাবি নতুন কোনো শর্ত নয়; এগুলো ইরানের অধিকার এবং আগের আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়।
তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে ইরানের প্রস্তাবে অনেক কিছু আগে থেকেই দেওয়ার দাবি রয়েছে এবং তেহরান আন্তরিকভাবে পারমাণবিক কর্মসূচির সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের সন্দেহ রয়েছে।
আগের আলোচনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এনবিসির সাক্ষাৎকারে আরাগচি দাবি করেন, এর আগেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসার বিষয়ে তেহরানের আস্থার সংকট রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, শান্তির কোনো সুযোগই নষ্ট করতে চায় না ইরান। তাই অতীত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলতি সপ্তাহে পরোক্ষ আলোচনা হতে পারে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পক্ষের অবস্থান কঠোর হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।
‘নির্বাচন নয়, জাতীয় স্বার্থই গুরুত্বপূর্ণ’
আরাগচি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব ইরানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানের কাছে মূল বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থ।
তিনি বলেন, ইরান যতটা কূটনীতির জন্য প্রস্তুত, ততটাই যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তেহরান একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিতে চাইছে—একদিকে সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার সংকেত, অন্যদিকে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করার বার্তা।
হরমুজেই আটকে আছে সমঝোতার বড় প্রশ্ন
বর্তমান সংকটে হরমুজ প্রণালি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়, বরং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দর-কষাকষির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইরান এটিকে নিজেদের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতা চাচ্ছে।
ফলে আরাগচির সর্বশেষ বক্তব্যে যুদ্ধের কঠোর সতর্কবার্তা এবং কূটনীতির আহ্বান—দুইটিই একসঙ্গে রয়েছে।
শিয়াল মারার ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো যুবকের
যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ থাকবে না আজ