সৌদি আরবের হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে ফ্রান্স

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে মোতায়েন করা ফরাসি সামরিক সরঞ্জাম ও সদস্যদের ভূমিকা ‘কঠোরভাবে প্রতিরক্ষামূলক’ থাকবে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো।

রোববার ফরাসি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মিত্র ও অংশীদারদের সুরক্ষায় ফ্রান্স সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করেছে। তবে সৌদি আরবে নতুন করে যে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা কোনোভাবেই সরাসরি সংঘাতে অংশ নেওয়ার অর্থ নয়।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় ফ্রান্স সেনাসদস্য, রাডার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে।

ইয়ানবু সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র। শহরটি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে এই অবকাঠামো দিয়ে সৌদি আরব লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে। সাম্প্রতিক হামলায় এই রুটের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

বারো বলেন, সৌদি অংশীদারের সুনির্দিষ্ট চাহিদা, ফ্রান্সের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে সেখানে কী ধরনের ও কতটা সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করা হবে।

হুথিদের হামলার পর ফরাসি সিদ্ধান্ত

সৌদি আরবে ফ্রান্সের সামরিক সহায়তার সিদ্ধান্তের পেছনে ইয়েমেনের হুথিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে। হুথিরাও ইয়ানবুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা এবং রিয়াদের একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলার দাবি করেছে। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়ানবুর তেল রপ্তানি অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপ প্রশমিত করা সম্ভব।

‘আমরা সংঘাতের পক্ষ হচ্ছি না’

সৌদি আরবের হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে ফ্রান্স কার্যত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বারো তা নাকচ করেন।

তার ভাষায়, ফ্রান্সের সহায়তা ‘কঠোরভাবে প্রতিরক্ষামূলক’। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফ্রান্স তার মিত্র ও অংশীদারদের সুরক্ষায় সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করছে; এর অর্থ এই নয় যে ফ্রান্স সংঘাতের কোনো পক্ষ হয়ে গেছে।

ফ্রান্সের একটি কূটনৈতিক সূত্রও এর আগে জানিয়েছিল, ইয়ানবু ও ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মতো সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় সহায়তা দেওয়া হবে, তবে এর মাধ্যমে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া হবে না।

বাব আল-মান্দাব নিয়ে উদ্বেগ

বারো বলেন, বাব আল-মান্দাব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যদিও সেখানে জাহাজ চলাচল কমেছে।

বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক তৎপরতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে জলপথটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি এবং লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৌদি তেল রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। এর ফলে সৌদি আরবকে কিছু তেল রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালিমুখী করতে হয়েছে।

সৌদির পাশে ইউরোপীয় সহায়তা বাড়ছে

ফ্রান্সের সিদ্ধান্তের আগে যুক্তরাজ্যও সৌদি আরবকে সীমিত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সৌদি অনুরোধের পর একটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স ভয়েজার বিমান দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক আকাশ-থেকে-আকাশে জ্বালানি সরবরাহের অনুমতি দিয়েছেন।

ফলে ইরান-সংক্রান্ত বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও আকাশ প্রতিরক্ষায় ইউরোপীয় দেশগুলোর সহায়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

ফরাসি সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়ানবুতে ফ্রান্সের মোতায়েনের মূল লক্ষ্য হলো সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষা, হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া নয়। তবে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এই প্রতিরক্ষামূলক মোতায়েনের পরিধি কী দাঁড়ায়, সেটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত